চেঙ্গিস খান কেন ভারত আক্রমণ করেননি? ইতিহাসের অমীমাংসিত রহস্য উন্মোচন
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু নাম
আছে, যাদের কথা শুনলে হৃদয়ে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি জন্মায়—ভয়, বিস্ময় আর কৌতূহল।
তেমন একজন মানুষ হলেন মহাঘাতক চেঙ্গিস খান—ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজয়ী। তাঁর সামরিক
অভিযানে তিনি কখনও পরাজিত হননি। যখন তিনি দিগ্বিজয়ের নেশায় পৃথিবী তোলপাড় করছেন, তখন
তাঁর অপ্রতিরোধ্য ওয়ার মেশিনকে ঠেকানোর সাধ্য যেন কারো ছিল না। তিনি চীন জয় করে বেইজিং
দখল করার মতো অসম্ভব কাজও হাসিল করে ফেলেছিলেন। মধ্য এশিয়ার কারাখিদাদের সাম্রাজ্য
এবং বিশাল খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য তাঁর পদতলে লুটিয়ে পড়েছিল। তবুও, এমন একজন সর্ববিজয়ী
শাসক, যিনি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর শাসক হতে পারতেন, তিনি সিন্ধু নদের তীরে পৌঁছেও
কেন পৃথিবীর অন্যতম ধনী ও সমৃদ্ধ দেশ ভারতবর্ষে হানা দিলেন না? এই সিদ্ধান্ত শতাব্দীর
পর শতাব্দী ধরে ঐতিহাসিকদের কাছে এক অমিমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে।
সময়টা ছিল ১২২১ সালের ২৪শে
নভেম্বর। সিন্ধু নদের তীর, যা এখনকার পাঞ্জাবের কলাবাগ শহরের কাছাকাছি। কুখ্যাত খুনি
বিজেতা চেঙ্গিস খান তখন রক্তে ভুল উত্তেজনা টের পাচ্ছিলেন; মাইলের পর মাইল দুর্গম পর্বতের
বাধা ডিঙিয়ে তিনি ছুটে এসেছেন খাওয়ারিজুম সাম্রাজ্যকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার শেষ লড়াইয়ের
জন্য। তাঁর সামনে তখন সেই ব্যক্তি—জালালাউদ্দিন, যিনি খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের শেষ শাহ
এবং মঙ্গলদের বিরুদ্ধে একের পর এক লড়াইয়ে পরাজিত। জালালাউদ্দিন মাত্র তিন হাজার সৈন্যের
অবশিষ্ট বাহিনী নিয়ে সিন্ধু নদ পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো
না, ততক্ষণে অর্ধ লক্ষ সৈন্য নিয়ে চেঙ্গিস খান সেখানে পৌঁছে গেছেন। পরাজয় নিশ্চিত
জেনেও, চেঙ্গিস খানের বিশাল বাহিনীর সামনে জালালাউদ্দিন মাথা নোয়ালেন না। ‘ব্যাটল অফ
ইন্ডাজ’ বা সিন্ধুর প্রথম ধাক্কায় অভাবনীয়ভাবে তিনি মঙ্গলদের ঠেকিয়েও দিয়েছিলেন,
কিন্তু বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। দুপুর নাগাদ জালালাউদ্দিন বুঝতে পারেন, যুদ্ধের ফলাফল
বহু আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে, তাই তিনি পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। হঠাৎই এক অবিশ্বাস্য
কাজ করে বসেন জালালাউদ্দিন—মঙ্গলদের প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে ঘোড়া দাবিয়ে প্রায় ত্রিশ
ফুট খাড়া পর্বতের গা বেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন সিন্ধুর জলে। জালালাদিনের এমন সাহসিকতায় চেঙ্গিস
খান এতটাই মুগ্ধ হন যে তিনি তাঁর তিরন্দাজদের নির্দেশ দেন তীর না ছুঁড়তে। ছেলেদের দিকে
তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, সৌভাগ্য ছাড়া এমন পুত্রের পিতা হওয়া যায় না। জালালাদিন, তাঁর
চার হাজারের কম সৈন্য নিয়ে কোনোমতে সিন্ধু পেরিয়ে প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
জালালাউদ্দিনের শাসনাধীন বিশাল
খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য দখল করেছিল চেঙ্গিসের মঙ্গল বাহিনী। বর্তমানকালের ইরান, তুর্কমেনিস্তান,
উজবেকিস্তান, কাজাকিস্তানের কিছু অংশ, তাজিকিস্তান, কিরজিগিস্তান এবং উত্তর ও পশ্চিম
ভারত তথা আফগানিস্তান জুড়ে বিস্তৃত ছিল এই বিশাল সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্য দখলের সময়
মঙ্গল হানাদারেরা সমরখন্দ, বোখারা, নিশাপুর সহ ঐতিহাসিক সব শহরে ধ্বংসচক্র চালায়।
মসজিদগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, পবিত্র কোরআন সহ ইসলামের সব ধর্মগ্রন্থ গুড়িয়ে দিয়ে
ইসলামের প্রাণভূমিকে ধ্বংস করে দেয় চেঙ্গিস খানের বাহিনী। উজবেকিস্তান থেকে পশ্চিম
ভারত পর্যন্ত জালালাদিনকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় মঙ্গলরা। জালালাদিনের সঙ্গে এই যুদ্ধেই চেঙ্গিস
খানের এক ছেলে এবং এক সেনাপতি প্রাণ হারিয়েছিলেন, কারণ জালালাউদ্দিনই প্রথমবারের মতো
মঙ্গল বাহিনীর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলে তাদের দিগ্বিজয় রুখে দিয়েছিলেন। কিন্তু
শেষ পর্যন্ত চেঙ্গিস খানের সর্বশক্তি নিয়োগের কাছে তিনি আর পেরে ওঠেননি।
এদিকে, সিন্ধু নদের ওপারে
তখন তৎকালীন ভারতবর্ষের অবস্থান। মুসলিম শাসকদের অধীনে থাকা ভারত তখন বিশ্বের অন্যতম
ধনী ও সমৃদ্ধ দেশ ছিল। সে সময় ভারতবর্ষ তুর্কি মামলুক রাজবংশের শাসনে ছিল। ১২০৬ সালে
কুতুবুদ্দিন আইবেগ এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর সেই সময় ভারতের শাসক ছিলেন এই
বংশের তৃতীয় সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ। জালালাউদ্দিনও তৎকালীন ভারতবর্ষের শাসক ইলতুতমিশের
মতো তুর্কি মামলুক বংশধর ছিলেন, তাই তিনি আশা করেছিলেন ইলতুতমিশ তাঁকে ভারতে আশ্রয়
দেবেন। চেঙ্গিস খান তখন সিন্ধু পেরিয়ে ভারতবর্ষে আক্রমণ করতে পারতেন। এতে একদিকে যেমন
জালালাউদ্দিনকে খতম করা যেত, অন্যদিকে দিল্লির সালতানাতের দখল নিয়ে সমৃদ্ধ ভারতবর্ষকেও
কুক্ষিগত করা যেত। কিন্তু চেঙ্গিস খান সেই সুযোগ পায়ে ঠেলে মঙ্গোলিয়ায় ফিরে যাওয়ার
সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি আফগানিস্তান শাসন করার জন্য নিজস্ব প্রশাসক এবং সৈন্যদের
রেখে গিয়েছিলেন, যারা ছিল আজকের হাজারাদের পূর্বপুরুষ।
কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর
খুঁজতে গিয়ে ঐতিহাসিকরা শত শত বছর ধরে বিভ্রান্ত হয়েছেন। চেঙ্গিস খান ছিলেন এমনই রহস্যময়
ব্যক্তিত্ব যে তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছুই এখনও অজানা রয়ে গেছে। জুলিয়াস সিজার বা নেপোলিয়ন
বোনেপার্টের মতো তিনি নিজ কর্মজীবনের কোনো স্মৃতিকথা বা বিবরণও রেখে যাননি। মূলত চেঙ্গিস
খান সম্পর্কে জানা যায় দুটি উৎস থেকে—প্রথমত, তাঁর মৃত্যুর পর লেখা ‘সিক্রেট হিস্ট্রি
অফ দ্য মঙ্গলস’ এবং দ্বিতীয়ত, তাঁর শত্রুদের দেওয়া বিবরণ। আমরা কমবেশি সবাই জানি তিনি
কী করেছেন, তবে তিনি কেন সেসব করেছেন, তার উত্তর প্রায় কারও জানা নেই। এই রহস্যের সমাধানের
জন্য বেশ কয়েকটি তত্ত্ব উঠে এসেছিল।
একটি দাবি করা হয় তাঁর এক
চীনা উপদেষ্টার জীবনীতে, যেখানে বলা হয়েছে একটি কথা বলা ইউনিকর্ন নাকি চেঙ্গিসের কাছে
উপস্থিত হয়ে তাঁকে ভারত থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। স্পষ্টতই,
এটি গালগল্প ছাড়া কিছুই নয়। পারস্য ইতিহাসবিদ যুবাহিনী বলেছিলেন, ভারতের গরম জলবায়ু
ঠান্ডা আবহাওয়ায় যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত মঙ্গল সেনাবাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু
সমস্যা হলো, ভারতবর্ষের শাসক মামলুকরাও তো শীত প্রধান অঞ্চল থেকে এসেছিল। তাই এ তত্ত্ব
সিংওয়ালা উড়ন্ত ঘোড়ার গল্পের মতোই কাল্পনিক বলে মনে করা হয়। আবার একটি ধারণা ছিল
ধর্মীয়। মঙ্গলীয়রা প্রাচীন বহু ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিল, যা ‘টেংরিজম’ নামে পরিচিত।
বলা হয়, এই টেংরিজমের সঙ্গে হিন্দুইজমের বেশ মিল পাওয়া যায়। এ কারণে অনুমান করা
হয়, তিনি হিন্দু ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের জন্ম দেওয়া এই পবিত্র ভূমিতে রক্তপাত ঘটাতে
চাননি। যদিও তিনি মুসলিমদের উপর বর্বরচিত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলেন, তাই ধর্মীয় কারণও
ততটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
চেঙ্গিস খান কেন ভারতে আক্রমণ
না করে মঙ্গোলিয়ায় ফিরে গেলেন, তা বুঝতে হলে তাঁকে একজন ব্যক্তি এবং একজন নেতা হিসেবে
বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কোন অনুপ্রেরণা তাঁকে কুখ্যাত হানাদার হিসেবে পরিচিতি দিয়েছিল,
তা জানার চেষ্টা করতে হবে। চেঙ্গিস খান বা তেমুজিনের জন্ম হয়েছিল মঙ্গোলিয়ায় ১১৫৫
থেকে ১১৬৭ সালের মধ্যে কোনো এক সময়। তাঁর বাবা ছিলেন বোর্জেগিন উপজাতির একজন ধনী এবং
প্রভাবশালী নেতা। মঙ্গলরা ছিল যাযাবর জাতি এবং চীনারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মঙ্গলদের
মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত বাধিয়ে রেখেছিল। চীনারা যখনই মঙ্গলদের একত্রিত হওয়ার চেষ্টা দেখত,
তখনই শাস্তিমূলক অভিযান শুরু করে তাদের দাস বানাতো বা হত্যা করত। চেঙ্গিস খানের এক
আত্মীয় খান আম্বাঘাই বেশ কয়েকটি উপজাতির একটি কনফেডারেশন তৈরি করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু
তেমুজিনের জন্মের কয়েক বছর আগে তাঁকে বন্দী করে চীনে নিয়ে গিয়ে নির্মমতার সঙ্গে
হত্যা করা হয়।
‘দ সিক্রেট হিস্ট্রি অফ মঙ্গলস’
থেকে জানা যায়, তেমুজিন যখন নয় বছরের শিশু, তখন তাঁর বাবা তাতার নামে পরিচিত এক তুর্কি
উপজাতি গোত্রের হাতে খুন হন। এরপর চেঙ্গিস খানের পরিবারও নিজ উপজাতিদের দ্বারা নির্বাসিত
হয় এবং তাদেরকে হিমশীতল ঠান্ডায় মৃত্যুর মুখে ফেলে দেওয়া হয়। মঙ্গোলিয়ায় শীতকালে
তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর নিচে। এমন কঠিন পরিবেশে নির্বাসিত
হওয়া মানেই ছিল মৃত্যুদণ্ড। তবে কঠোর পরিবেশ ও নিঃৃশংসতার মাঝেও চেঙ্গিস খান টিকে যান।
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর বাবার মৃত্যুর পর সেই সম্পদ কোনো কাজেই আসেনি, সব বেদখল
হয়ে গিয়েছিল। তাই চেঙ্গিস খান ভালোভাবে বুঝতে পারেন যে সম্পদের চেয়ে ক্ষমতার মূল্য
অনেক বেশি। ক্ষমতা যে কাউকে সম্পদশালী করতে পারে, কিন্তু সম্পদ কাউকে ক্ষমতাশালী করতে
পারে না। ক্ষমতাবান নয় এমন কেউ সম্পদশালী হলেও তার সেই সম্পদ রক্ষা করা যায় না। এই
উপলব্ধির কারণে বাকি জীবন তিনি কেবল ক্ষমতার পেছনে ছুটেছেন। বস্তুত, তিনি সম্পদকে ঘৃণা
করতেন এবং এটিকে কেবল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাই তিনি মনোনিবেশ করেছিলেন
যুদ্ধবিদ্যা ও ক্ষমতা অর্জনের দিকে।
১২০৬ সালে, প্রায় পঞ্চাশ বছর
বয়সে, তেমুজিন প্রতিটি মঙ্গল উপজাতিকে পরাস্ত করে একটি ঐক্যবদ্ধ মঙ্গল জাতি তৈরি করেন
এবং তাঁকে ‘চেঙ্গিস খান’ বা ‘সার্বজনীন শাসক’ উপাধি দেওয়া হয়। যখন একটি জাতি সদ্য
গঠিত হয় এবং উপজাতিরা বহু শতাব্দী ধরে একে অপরের সাথে লড়াই করে এসেছে, তখন তাদের
ধরে রাখা এবং পুরনো বিভাজন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা রুখতে তাদের একত্রিত করে কোনো কাজে ব্যস্ত
রাখা ছিল সহজ উপায়। চেঙ্গিস খান সেটাই করেছিলেন, তিনি তাদের চীন আক্রমণে নিয়ে যান।
এই আক্রমণ ছিল মূলত প্রতিশোধমূলক—আত্মীয় আমবাঘাই হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া এবং কয়েক
শতাব্দীর হস্তক্ষেপ ও নির্মমতার জন্য চীনাদের শাস্তি দেওয়া। ১২১০ সালের মধ্যে তিনি
ওয়েস্টার্ন জিয়া সাম্রাজ্য দখল করে নেন এবং সেখানকার সম্রাট মঙ্গল শাসনের কাছে নতি
স্বীকার করেন। ১২১৫ সালে তিনি জীন রাজবংশের অঞ্চলে আক্রমণ শুরু করেন এবং বেইজিং দখল
করে নেন।
তাঁর আক্রমণ সব সময়ই ছিল প্রতিশোধমূলক।
১২১৮ সালে যখন কারাখিতাই সাম্রাজ্য একটি মঙ্গল শহর দখল করে নেয় এবং চেঙ্গিস খানের নাতিকে
হত্যা করে, তখন প্রতিশোধ হিসেবেই তিনি কারাখিতাই দখল করেন। একইভাবে, অত্যন্ত গুরুতর
উস্কানির প্রতিশোধ নিতেই তিনি খাওয়ারিজম আক্রমণ করেন। যখন খাওয়ারিজমের সুলতান আলালদিন
মোহাম্মদ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি দলকে হত্যা করান এবং চেঙ্গিস খানের দূতদের অপমান করেন,
তখন চেঙ্গিস খান ক্ষিপ্ত হয়ে হামলা চালান এবং পুরো সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেন। খাওয়ারিজম
জয়ের পর, তিনি আবারো চীনে ফিরে যান কারণ ওয়েস্টার্ন জিয়া সম্রাট, যিনি তাঁর ভাসাল
ছিলেন, বিশ্বাসঘাতকতা করে সৈন্য সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ, চেঙ্গিস
খানের পুরো কর্মজীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তিনি তখনই যুদ্ধে গিয়েছিলেন যখন তাঁর
কাছে প্রতিশোধ নেওয়ার মতো সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল।
সুতরাং, ভারতবর্ষে আক্রমণ
না করার কারণ খুঁজতে গেলে তাঁর এই প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাবের দিকেই নজর দিতে হবে। চেঙ্গিস
খান যখন জালালাদিনকে অনুসরণ করে পাঞ্জাব আক্রমণ করেন, তখন তৎকালীন ভারতবর্ষের সুলতান
ইলতুতমিশ বুদ্ধিমানের মতো হাত গুটিয়ে রেখেছিলেন। পাঞ্জাব তাঁর আঞ্চলিক অংশ হওয়া সত্ত্বেও
তিনি কোনো হস্তক্ষেপ করেননি। আরও চতুরতার সাথে তিনি জালালাদিনকে ভারতে আশ্রয় দিতে
অস্বীকার করেছিলেন। এই দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে ইলতুতমিশ চেঙ্গিস খানের নজর
ভারতবর্ষ থেকে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
চেঙ্গিস খান কেন জালালাদিনকে
তাড়া করে হত্যা করেননি? এর উত্তর সহজ—সেনাবাহিনী ধ্বংস হওয়ার সাথে সাথে সাম্রাজ্য
হারা জালালাদিন আর কখনও সত্যিকারের হুমকি হয়ে উঠবে না, তা বুঝতে পেরেছিলেন চৌকস চেঙ্গিস
খান। তাঁর কাছে তখন ওয়েস্টার্ন জিয়ার সাম্রাজ্যের উপর প্রতিশোধ নিতে ব্যস্ত হয়ে
পড়া বেশি জরুরি ছিল।
কিন্তু ভারতবর্ষের অমূল্য
ধনসম্পদ কি চেঙ্গিস খানকে প্রলুব্ধ করেনি? সম্ভবত করেনি। আগেই বলা হয়েছে, তিনি সম্পদকে
ঘৃণা করতেন এবং এটিকে কেবল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর সেনারা বিভিন্ন সাম্রাজ্য
বিজয়ের সময় প্রচুর পরিমাণে ধনসম্পদ লুট করেছিল, কিন্তু তিনি ব্যক্তিগতভাবে এর কিছুই
রাখেননি। সেসব তিনি তাঁর সৈন্য এবং কমান্ডারদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিয়েছিলেন।
তাই ভারতবর্ষের ধনসম্পদ চেঙ্গিস খানকে আকৃষ্ট করেনি।
আবার এটাও সম্ভব যে, হয়তো
তিনি ভারতবর্ষের মানুষের ক্ষতি করতে চাননি। তিনি জানতেন যে আক্রমণ চালালে বিপুল সংখ্যক
নিরীহ সাধারণ মানুষের মৃত্যু হবে। গবেষণায় এও উঠে আসে যে চেঙ্গিস খান হয়তো ভারতবর্ষের
সাথে একটি সাংস্কৃতিক সখ্যতা অনুভব করেছিলেন। মঙ্গলীয় সমাজ এবং সংস্কৃতির মধ্যে আজও
ভারতীয় প্রভাব দেখতে পাওয়ার দাবি করেন গবেষকরা।
তবে শেষ পর্যন্ত, চেঙ্গিস
খান কেন ভারতবর্ষে আক্রমণ করেননি, তার নির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করে এমন কোনো সাক্ষ্য
বা প্রমাণ আজও মেলেনি। তবে ঘটনাক্রম ও চেঙ্গিস খানের কর্মজীবন বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়,
চেঙ্গিস খানের আক্রমণ শুধুমাত্র প্রতিশোধমূলক ছিল এবং ভারতবর্ষের তৎকালীন শাসক ইলতুতমিশ
যে বিচক্ষণ পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে চেঙ্গিস খানের নজর ভারতবর্ষের উপর নিবদ্ধ হতে দেননি,
তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। চেঙ্গিস খান যখন ভারতে আক্রমণের সুযোগ পেয়েও পিছু হটেন,
তখন সেটি যেন এক উন্মুক্ত বাক্সের মতো, যার ভেতরে কী ছিল তা আমরা জানি, কিন্তু সেই
বাক্স বন্ধ রাখার মূল কারণটি আজও অজানা—যা আমাদের কেবল অনুমান করতে বাধ্য করে।

কোন মন্তব্য নেই