Header Ads

Header ADS

কিম শাসনের অদৃশ্য শৃঙ্খল: কেন উত্তর কোরিয়ায় সেনা অভ্যুত্থান অসম্ভব?

 


একবার ভেবে দেখুন তো, এমন এক জনপদের কথা যেখানে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে এক রহস্যময় কুয়াশার চাদরে। মানচিত্রের এক কোণে পড়ে থাকা ছোট্ট একটি দেশ, যার চারপাশ নিশ্ছিদ্র দেয়াল আর কাঁটাতারে ঘেরা। পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন আর স্বৈরাচারী দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এই উত্তর কোরিয়া যেন এক ভিন্ন গ্রহের গল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোর পর থেকেই এখানে চলছে এক অবিশ্বাস্য শাসন—কিম পরিবারের রাজত্ব। জুচে মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই দেশের মূল মন্ত্র হলো আত্মনির্ভরশীলতা আর নেতার প্রতি অন্ধ আনুগত্য। এই আনুগত্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন কিম ইল সাং, যা পরবর্তীতে তাঁর ছেলে কিম জং ইলের সময়ে এক লৌহকঠিন রূপ নেয় এবং বর্তমানে কিম জং উনের শাসনে তা হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু আপনার মনে কি কখনও এই প্রশ্ন জেগেছে যে, যে দেশে সামান্য ভিন্ন মত পোষণ করলেই নেমে আসে অবর্ণনীয় শাস্তি, যেখানে খাদ্য সংকট নিত্যদিনের সঙ্গী, যেখানে মানুষের মানবাধিকার বলে কিছু নেই, সেখানে কেন কখনও কোনো সফল গণঅভ্যুত্থান বা সামরিক অভ্যুত্থান হয় না? গত ৭০ বছরের ইতিহাসে কিম পরিবার একাধিক দুর্ভিক্ষ, চরম অর্থনৈতিক সংকট আর ভয়াবহ নেতৃত্বের ব্যর্থতা দেখেছে, কিন্তু তবুও কেন কোনো সেনাপতি বা কোনো জনতা কিম পরিবারের একচ্ছত্র ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিতে পারেনি?


সাধারণত পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে আমরা দেখি, যখন সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে কিংবা সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্তারা মনে করেন যে শাসকের পতন দরকার, তখন তারা রাজধানীর দিকে ট্যাঙ্ক নিয়ে এগিয়ে যায় এবং রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। ২০২০ সালে মালিতে কিংবা ২০২২ সালে বুরকিনা ফাসোতে আমরা এমন সফল অভ্যুত্থান দেখেছি, যেখানে অসন্তুষ্ট জেনারেলরা রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তার করে ক্ষমতার মসনদ উল্টে দিয়েছিল। তবে উত্তর কোরিয়ায় এই চিরচেনা ফর্মুলা কেন খাটছে না তার উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রবেশ করতে হবে এক নিষ্ঠুর রাজনৈতিক খেলার ভেতরে। কিম পরিবার আসলে এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে যা পৃথিবীর অন্য যে কোনো ব্যবস্থার চেয়ে নেতার প্রতি আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। গত কয়েক দশকে কিম জং উন এবং তাঁর পূর্বসূরিরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এবং নির্মমভাবে দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অভিজাতদের একে একে সরিয়ে দিয়েছেন যখনই তাদের মনে হয়েছে কারো আনুগত্যে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরেছে। উত্তর কোরিয়ায় শুদ্ধি অভিযান বা 'পার্জ' (purge) শব্দটা খুব সাধারণ। কিম জং উন যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি ছিলেন একেবারেই তরুণ আর অনভিজ্ঞ। সেই প্রথম বছরগুলো ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক, কারণ বড় বড় প্রবীণ জেনারেলদের কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা ছিল প্রবল। কিম জং উন ঠিক কী করেছিলেন জানেন? তাঁর বাবা কিম জং ইল মারা যাওয়ার ঠিক আগে পলিটিক্যাল ব্যুরোর প্রায় ৮০ শতাংশ সদস্যকে প্রতিস্থাপন করেছিলেন যাতে তাঁর ছেলে কোনো চ্যালেঞ্জ ছাড়াই ক্ষমতা হাতে পায়। ক্ষমতা গ্রহণের পর কিম জং উন নিজেও পলিটিক্যাল ব্যুরোর ৪২ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে আবারও ১৩ শতাংশ সদস্যকে সরিয়ে দিয়ে নিজের অনুগতদের বসিয়েছেন। এমনকি ২০২৩ সালের সামরিক কুচকাওয়াজের আগের কয়েক সপ্তাহে তিনি পার্টি সচিবালয়ের ১২ জন কর্মকর্তার মধ্যে ৫ জন এবং পলিটিক্যাল ব্যুরোর ১৭ সদস্যের মধ্যে ৭ জনকে হঠাৎ করেই সরিয়ে দেন।


এই নির্মমতার উদাহরণগুলো শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। ২০১২ সালে সেনাবাহিনীর উপমন্ত্রী কিম চোলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল শুধু এই অভিযোগে যে, কিম জং ইলের শোক পালনের সময় তিনি মদ্যপান আর হৈহুল্লোড় করেছিলেন। সেনাপ্রধান রি ইয়ং হো, যিনি কিম জং উনকে ক্ষমতা গ্রহণে সাহায্য করেছিলেন এবং প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে দ্বিমত পোষণ করায় তাঁকেও পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে শোনা যায়। কিম জং উনের নিষ্ঠুরতা থেকে রক্ষা পায়নি তাঁর নিজের রক্তও। তাঁর সৎ ভাই কিম জং নাম, যিনি একসময় উত্তরাধিকারী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন, ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে রহস্যজনক এক নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগের মাধ্যমে হত্যার শিকার হন। এমনকি কিম জং উনের নিজের প্রভাবশালী চাচা জ্যাং সং থেক, যিনি ছিলেন কিমের আক্ষরিক অর্থে অভিভাবক, তাঁকেও ২০১৩ সালে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সব হত্যাকাণ্ড কেবল প্রতিপক্ষ নির্মূল নয়, বরং ক্ষমতার পথে কোনো কাঁটা যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে তার জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। কিন্তু তার মানে এই নয় যে মানুষ চেষ্টা করেনি। ইতিহাসের পাতায় ধুলো জমলেও এমন বেশ কয়েকবার হয়েছে যখন কিম পরিবারকে ক্ষমতাচ্যুত করার খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল অভ্যুত্থানকারীরা। উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সাংয়ের আমলেই সোভিয়েতপন্থী আর চীনপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চেয়েছিল। ১৯৫৬ সালের এক গ্রীষ্মে যখন কিম মস্কো সফরে গিয়েছিলেন, তখন এই দলগুলো তাঁকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করে। কিন্তু কিমের অনুগতরা সেই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেয় কারণ সাধারণ সদস্যদের কাছে একজন 'বিদেশী অনুগত' নেতার চেয়ে 'নিশংস দেশীয়' কিম ইল সাং অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ছিলেন। ফলাফল হিসেবে কিম ইল সাং আরও বড় আকারে শুদ্ধি অভিযান চালান এবং ১৯৬০ সালের মধ্যে বিরোধী গোষ্ঠীর প্রায় সবাইকেই হয় বহিষ্কার করেন নয়তো মৃত্যুদণ্ড দেন।


১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন উত্তর কোরিয়ায় চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। চারদিকে দাঙ্গা আর বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। ঠিক সেই সময় উত্তর কোরিয়ার গণবাহিনীর একাংশ এবং হামহুং সদর দপ্তরের সপ্তম কোর একটি বিদ্রোহের ছক কষেছিল। তারা চেয়েছিল আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা যখন দেশটিতে পরিদর্শনে আসবে, ঠিক তখনই বিদ্রোহ শুরু করে বিশ্বকে তাদের সমর্থনের কথা জানাবে। কিন্তু কিম পরিবারের ভাগ্য এতটাই সুপ্রসন্ন ছিল যে, সেই আইএইএ (IAEA) আসার আগেই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিভাগ সব ষড়যন্ত্রকারীকে গ্রেপ্তার করে ফেলে। এরপর ১৯৯৫ সালে চংজিনে ষষ্ঠ আর্মি কোরের অভ্যুত্থানের চেষ্টা ছিল সম্ভবত সবচেয়ে বড় হুমকি। দুর্ভিক্ষের সময় পিয়ংইয়ং যখন ক্ষুধার্ত মানুষদের খাবার না পাঠিয়ে বিলাসিতায় মত্ত ছিল, তখন এই কোরের কর্মকর্তারা চংজিনের যোগাযোগ কেন্দ্র, বন্দর এবং ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্রগুলো দখল করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাদের পরিকল্পনা ছিল পিয়ংইয়ংয়ের দিকে অগ্রসর হয়ে সব রাজনৈতিক অভিজাতকে গ্রেপ্তার করা। কিন্তু আবারও সেই চিরচেনা কাহিনী—ষড়যন্ত্রের খবর আগেভাগেই ফাঁস হয়ে যায় এবং অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার আগেই প্রায় ৪০০ কর্মকর্তাকে হয় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় নয়তো নিখোঁজ করে দেওয়া হয়।


উত্তর কোরিয়ায় অভ্যুত্থান সফল না হওয়ার পেছনে আরও কিছু মনস্তাত্ত্বিক আর কৌশলগত কারণ রয়েছে। যেমন সেখানকার ‘থ্রি জেনারেশন রুল’ বা তিন প্রজন্মের শাস্তির নিয়ম। যদি একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার চেষ্টা করে, তবে কেবল তাকেই নয়, তার পরিবারের তিন প্রজন্মকে শ্রমশিবিরে পাঠানো হয়। এই ভয়াবহ শাস্তির কথা মাথায় রেখে কেউ বিদ্রোহ করার সাহস পায় না। এছাড়া দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা এতটাই বিলাসিতায় অভ্যস্ত যে তারা কিমের পতন মানে নিজেদেরও পতন বলে মনে করে। তাই তারা কিমের প্রতি আরও বেশি অনুগত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সাধারণ সেনাদের কখনোই তাদের নিজ শহরে মোতায়েন করা হয় না, বরং তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় দূরবর্তী কোনো দুর্গম অঞ্চলে যাতে তারা স্থানীয় মানুষের সাথে বা নিজ সহকর্মীদের সাথে কোনো গভীর জোট তৈরি করতে না পারে। আর পশ্চিমা শক্তিগুলো কেন এখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে না? আসলে উত্তর কোরিয়া আপনার ধারণার চেয়েও বেশি শক্তিশালী এবং নিশ্ছিদ্র দেয়ালের ভেতর বন্দি। সিআইএ-র সাধারণ কৌশল যেমন অন্য দেশে ডেমোক্রেসি এনজিও বা তথ্যের স্বাধীনতা দিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা, তা উত্তর কোরিয়ায় অসম্ভব। কারণ দেশটিতে তথ্য প্রবেশের কোনো পথ নেই, এমনকি কোনো বিদেশি গোষ্ঠী সেখানে কাজ করার সুযোগও পায় না। এছাড়া কিম জং উন জানেন তাঁর সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলো পারমাণবিক অস্ত্র। কিমের শাসনামলে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পরিমাণ আগের চেয়ে ১০ গুণ বেড়েছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র বা দক্ষিণ কোরিয়া কোনো অভ্যুত্থানের উসকানি দেয় এবং কিম যদি মনে করেন তাঁর রাজত্ব বিপন্ন, তবে তিনি সিউল বা ওয়াশিংটনের দিকে পারমাণবিক বোমা ছুড়তে দ্বিধা করবেন না। উত্তর কোরিয়ার কাছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সেনাবাহিনী আছে এবং সিউলের দিকে হাজার হাজার কামানের মুখ ঘোরানো রয়েছে যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো শহর ধ্বংস করে দিতে পারে। এই চরম ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তার কারণেই কিম পরিবার বছরের পর বছর ধরে টিকে আছে। তবে ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং কিম পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের উত্তরাধিকারী কিম জো আইয়েকে নিয়ে অভ্যন্তরীণ মহলে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। তবুও এই লৌহকঠিন দুর্গে ফাটল ধরবে নাকি আনুগত্যের এই অন্ধ রাজত্ব চলতেই থাকবে, তা সময়ই বলে দেবে।

এই রহস্যময় দেশটি যেন এক জটিল ধাঁধা, যেখানে আনুগত্য কেনা হয় ভয় আর বিলাসিতা দিয়ে, আর যে কোনো বিদ্রোহের স্বপ্ন রক্ত দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয় শুরুতেই। উত্তর কোরিয়ার এই ব্যবস্থাটি আসলে একটি নিখুঁতভাবে তৈরি 'কারাগার', যেখানে কারারক্ষীরাই কয়েদিদের রক্ষক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কারণ তাদের ভাগ্য একই সুতোয় গাঁথা।

 


কোন মন্তব্য নেই

PLAINVIEW থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.