Header Ads

Header ADS

দোলনচাঁপা (Hedychium coronarium): বৈজ্ঞানিক নাম, উৎস ও সৌন্দর্যের রহস্য

 


দোলনচাঁপা—নামটিতেই যেন লুকিয়ে আছে মিষ্টি এক সুরভি, নরম এক সৌন্দর্য। বর্ষা কিংবা শরৎের সন্ধ্যা যখন হালকা বাতাসে ভিজে ওঠে, তখন সাদা প্রজাপতির মতো দোলনচাঁপা ফুলগুলো দুলে ওঠে নিজের ছন্দে। এই ফুল শুধু চোখে আনন্দ আনে না, তার সুবাসে মুগ্ধ হয় মনও।

দোলনচাঁপা ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম Hedychium coronarium, যা Zingiberaceae বা আদা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ইংরেজিতে একে বলা হয় Butterfly Ginger Lily, আবার কেউ কেউ বলেন White Ginger Lily বা Dolan Champa। এর নামের মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের কোমলতা, যেমন এর রঙ—উজ্জ্বল সাদা, আর গন্ধে থাকে হালকা মিষ্টি আবেশ।

এই ফুলের আদি নিবাস নেপাল ও ভারতের হিমালয় অঞ্চল। তবে এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে দুনিয়ার নানা প্রান্তে—ফ্লোরিডা, ক্যারিবিয়ান, গল্ফ কোস্ট, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার উষ্ণ-উপউষ্ণ অঞ্চলে। শীতকালে এরা মাটির নিচে নিস্তব্ধ হয়ে যায়, কিন্তু গ্রীষ্মের উষ্ণ ছোঁয়ায় আবার নতুন করে প্রাণ পায়।

দোলনচাঁপা গাছ দেখতে অনেকটা আদা গাছের মতো, কারণ এটি রাইজোম বা কন্দ থেকে জন্মায়। এর উচ্চতা সাধারণত ১ থেকে ২ মিটার, পাতাগুলি বল্লমাকৃতির এবং সূঁচালো আগা যুক্ত। পাতা লম্বায় ২০ থেকে ৬১ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় ৫ থেকে ১৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। গ্রীষ্ম থেকে শরৎ পর্যন্ত গাছে আসে গুচ্ছফুল, আর প্রতিটি গুচ্ছের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার

দোলনচাঁপার প্রতিটি ফুলে থাকে চারটি পাপড়ি, যা দেখতে অনেকটা উড়ন্ত প্রজাপতির মতো। সেই কারণেই ইংরেজি নামের মধ্যে রয়েছে “Butterfly” শব্দটি। সন্ধ্যার সময় ফুলগুলো ফুটে ওঠে, আর বাতাসে ছড়ায় মিষ্টি সুবাস। রাতের নরম আলোয় এই ফুলগুলো যেন সাদা প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায় চারপাশে।

দোলনচাঁপার ইতিহাসও কম চিত্তাকর্ষক নয়। একসময় এটি ব্রাজিলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ক্রীতদাস যুগে। সেখানে ক্রীতদাসেরা এর পাতাকে তোষকের মতো ব্যবহার করতো। তবে এখন সেই একই দেশে এটি “রাক্ষুসে আগাছা” হিসেবে বিবেচিত, কারণ দোলনচাঁপা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। হাওয়াই অঞ্চলেও এর একই অবস্থা—সৌন্দর্যের পাশাপাশি এক প্রকার বুনো আধিপত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে এই ফুল।

আরও এক চমকপ্রদ তথ্য হলো—দোলনচাঁপা কিউবার জাতীয় ফুল। স্পেনীয় উপনিবেশ আমলে কিউবার নারীরা এই ফুলের মধ্যেই গোপন বার্তা লুকিয়ে আদান-প্রদান করতেন। তখন ফুলটি হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতা ও প্রতিরোধের এক নীরব প্রতীক। ভাবুন তো, একটি ছোট সাদা ফুল কত গভীর ইতিহাসের সাক্ষী!

দোলনচাঁপার ফুল ঝরে গেলে বীজাধার উন্মুক্ত হয়, যার ভেতরে থাকে উজ্জ্বল লাল বীজ। এই বীজই পরবর্তী প্রজন্মের গাছের জন্ম দেয়। জীবনের মতোই যেন ফুলটিরও এক চক্র—ফোটা, ঝরা, আর আবার ফোটা।

আজ দোলনচাঁপা শুধু একটি ফুল নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতিতেও জায়গা করে নিয়েছে। বাংলার কবি ও লেখকরা বারবার এই ফুলের সুবাসে খুঁজে পেয়েছেন প্রেম, পবিত্রতা আর সৌন্দর্যের প্রতীক। গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় যখন দোলনচাঁপার গন্ধ ভেসে আসে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজেই নরম সুরে গান গাইছে—
“দুলে দুলে হাসে দোলনচাঁপা,
শুভ্রতা তার শান্তির ছায়া।”

এই ফুলের মধ্যেই মিশে আছে প্রকৃতির নরম স্পর্শ, ইতিহাসের গল্প, আর জীবনের এক চিরন্তন ছন্দ। দোলনচাঁপা তাই শুধু ফুল নয়—এ এক সাদা প্রজাপতির স্বপ্ন, যা দুলে ওঠে প্রতিটি বাতাসে, ছড়িয়ে দেয় তার স্নিগ্ধ সুবাসে পৃথিবীর সৌন্দর্য।

কোন মন্তব্য নেই

PLAINVIEW থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.