ডলারের পতন ও স্বর্ণের উত্থান: মুদ্রাস্ফীতি, যুদ্ধ এবং সোনার দাম বাড়ার আসল কারণ কী?
আমরা এমন একটা সময়ের ভেতর দিয়ে চলেছি যেখানে পৃথিবী যেন এক অনিশ্চিত সমুদ্রের ওপর ভাসছে। একদিকে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আর বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি। অন্যদিকে, বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলো ঋণের ভারে নুয়ে পড়েছে। মানুষের হাতে থাকা কাগজের মুদ্রা, শেয়ার বাজার বা ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর থেকে বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই সময়ে, ইতিহাসের পাতা উল্টে মানুষ আবারও ফিরে যাচ্ছে সেই পুরনো ভরসার প্রতীক—স্বর্ণের কাছে। আজকে আমরা সেই রহস্যের গভীরে ডুব দেব—কেন স্বর্ণ শুধু অলংকার নয়, বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছে? আর কেন বিশ্বজুড়ে এর দাম এখন ইতিহাসের সকল রেকর্ড ভেঙে প্রতি আউন্সে ৪০০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে?
রুপার দামও দ্রুত বাড়ছে, ফলে পুরো মূল্যবান ধাতুর বাজারে এক ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির মূল কারণ হলো চারপাশের বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। যখনই বিশ্বে কোনো বড় সংকট, যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক ধ্বস দেখা দেয়, তখনই বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেয়। আর এই মুহূর্তে ঠিক সেই ঘটনাই ঘটছে—ডলার দুর্বল হচ্ছে, শেয়ার বাজার অস্থিতিশীল হচ্ছে, এবং বড় বড় অর্থনীতি মন্দার আশঙ্কায় দুলছে। সবাই খুঁজছে এমন একটি সম্পদ, যার মূল্য কোনোদিন শূন্যে নেমে যাবে না। সেই কারণেই স্বর্ণ আবারও মানুষের বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যত বেশি অনিশ্চয়তা বাড়ে, তত বেশি মানুষ স্বর্ণ কেনে, ফলে স্বর্ণের দামও আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি এক জটিল চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই চাপের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট সংকট, যা বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে অস্থীতিশীলতা ছড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন সরকারের অতিরিক্ত ঋণ, বিশাল বাজেট ঘাটতি এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে রীতিমতো আতঙ্কিত। তারা নিজেদের সম্পদ এমন এক জায়গায় রাখতে চাইছে, যা সবচেয়ে নিরাপদ। অর্থনীতিবিদরা এই অবস্থাকে বলছেন 'আধুনিক যুগের গোল্ড রাশ' বা স্বর্ণের দৌড়।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সুদের হার কমানোর চাপ। উচ্চ সুদের হার একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান কমাচ্ছে এবং অর্থনীতিকে স্থবির করে তুলছে। কিন্তু সুদের হার কমালে মুদ্রাস্ফীতির নতুন ঢেউ তৈরি হতে পারে, যা মানুষের সঞ্চয়ের মূল্যকে আরও কমিয়ে দিতে পারে। তাই সাধারণ মানুষ এবং বিনিয়োগকারীরা উভয়েই এমন সম্পদ খুঁজছে, যা মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকবে—আর এক্ষেত্রে একমাত্র নিরাপদ বিকল্প হলো স্বর্ণ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বিশ্বব্যাপী ঋণের পাহাড়। প্রায় প্রতিটি দেশেই সরকার এবং কর্পোরেট পর্যায়ে ঋণের পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে, অনেক অর্থনীতি এখন শুধু সুদের টাকা পরিশোধ করতেই হিমশিম খাচ্ছে। মানুষ এখন এমন সম্পদে বিনিয়োগ করতে চায়, যার কোনো ডিফল্ট ঝুঁকি নেই—যা কখনো দেউলিয়া হবে না। অন্যদিকে, অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। এর একটি গোপন কৌশল হলো, সরকার চাইছে যেন ঋণের প্রকৃত মূল্য ধীরে ধীরে কমে যায়। মুদ্রাস্ফীতি যত বাড়বে, ঋণের প্রকৃত বোঝা ততটাই কমে আসবে। এই কঠিন বাস্তবতায় শেয়ার বাজারের অস্থিরতা, ক্রিপ্টোকারেন্সির অনিশ্চয়তা এবং বন্ড বাজারের প্রতি আস্থার পতন হওয়ায়, একমাত্র স্বর্ণই বিশ্বের সত্যিকারের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে টিকে আছে। স্বর্ণ এমন একটি সম্পদ যা কোনো সরকারের ব্যর্থতায় ডুবে যায় না, কোনো কোম্পানির পতনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্য আরও বেড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড বাজারকে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করা হতো। বিনিয়োগকারীরা নিশ্চিন্তে নিজেদের অর্থ ধরে রাখতে চাইলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করতো। কারণ এত শক্তিশালী অর্থনীতি এবং স্থিতিশীল সরকারের ঋণ আদায় নিয়ে কোনো আশঙ্কা ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ধারণা ভেঙে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ ঋণ, বাজেট ঘাটতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা এই আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
মার্কিন সরকার প্রায়ই ঋণের সীমা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে, যা বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের মনে এক ধরনের বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ফলে ঐতিহ্যগতভাবে যে মার্কিন বন্ডকে 'সেফ হেভেন' বা নিরাপদ আশ্রয় বলা হতো, সেই ভাবমূর্তি এখন অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলো একসময় অকল্পনীয় হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিভাজন, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন ক্রেডিট রেটিং এর এই অবনমন শুধু প্রতীকী নয়, এটি মার্কিন ডলারের প্রতি বিশ্বের আস্থার ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো এখন তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের পরিবর্তে স্বর্ণের পরিমাণ বাড়াচ্ছে। তারা বিশ্বাস করছে, কাগজের মুদ্রা ক্রমেই ঋণের চাপে দুর্বল হচ্ছে এবং সেটি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এক প্রকার ডিডলারাইজেশন বা ডলার নির্ভরতা কমানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র থেকে মূলধনের বহিঃপ্রবাহ বেড়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বড় বিনিয়োগকারীরা বিকল্প আশ্রয় খুঁজছেন। যখন অর্থনীতি ও রাজনীতি অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, তখন বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন—আর সেই জায়গাতেই স্বর্ণ আবারও নেতৃত্ব দিচ্ছে। জাপানের মুদ্রানীতি শিথিলের ফলে ইয়েনের মান কমে যাওয়ায়, একসময় নিরাপদ মুদ্রা হিসেবে পরিচিত সেই ইয়েনও আর আগের অবস্থানে নেই। তাই নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতিযোগিতায় স্বর্ণই এখন সবচেয়ে উজ্জ্বল বিকল্প।
এই অনিশ্চিত পরিবেশে শুধু সাধারণ মানুষ বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাই নয়, বরং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও এখন বিপুল পরিমাণে স্বর্ণ কিনছে। একসময় তারা মূলত মার্কিন ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ড বা ইউরোর মতো বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ হিসেবে রাখতো। কিন্তু এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বুঝতে পারছে যে, কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকটে মার্কিন ডলারের মতো কাগজে মুদ্রা মুহূর্তেই পড়ে যেতে পারে, কিন্তু বিপরীতে স্বর্ণের মূল্য থাকবে স্থিতিশীল। ডলারের পতনের পেছনে আরও একটি বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ ডলার বাজেয়াপ্ত করেছে। এই ঘটনার পর অনেক দেশ বুঝে গেছে, ডলারে রাখা রিজার্ভ সম্পদ আসলে নিরাপদ নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ সম্পদ মুহূর্তেই জব্দ হতে পারে। ফলে তারা দ্রুত বিকল্প খুঁজছে, আর সেই বিকল্পের প্রথম নামই হলো স্বর্ণ। তাই বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ বাড়াচ্ছে, যা দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে আরও দ্রুত করছে।
ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতও স্বর্ণের চাহিদাকে আরও জ্বালানি দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। এই অস্থিরতা যত বাড়ছে, বিনিয়োগকারীরা ততই স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছে। ফলে এখন স্বর্ণ শুধু গহনার প্রতীক নয়, এটি পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতীক এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলার এক অনন্য অস্ত্রে। অর্থনীতি ও কূটনীতির এই অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে স্বর্ণই এখন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঢাল। হাজার বছরের ইতিহাসে স্বর্ণ কেবল এক খণ্ড ধাতু নয়। এটি মানুষের বিশ্বাস, সম্পদ ও নিরাপত্তার প্রতীক। প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক অর্থনীতি পর্যন্ত এর গুরুত্ব অটুট রয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব সমাজেই স্বর্ণকে সম্পদের মাপকাঠি ও আর্থিক স্থিতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বিশেষত ভারত, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে স্বর্ণের একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও আবেগীয় ভূমিকা রয়েছে। ভারতে এটি এখনো যৌতুকের অংশ হিসেবে বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম। ফলে মানুষের মনে স্বর্ণের প্রতি এক ধরনের গভীর বিশ্বাস তৈরি হয়েছে, যা কোনো আধুনিক কাগজে মুদ্রা দিতে পারে না। বর্তমানে এই বিশ্বাসই আবারো অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী এখন কাগজের মুদ্রা বা ফিয়াট কারেন্সির প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা বিকল্প হিসেবে স্বর্ণকে বেছে নিচ্ছেন, কারণ স্বর্ণের মূল্য কোনো সরকারের সিদ্ধান্তে বদলায় না। বরং স্বর্ণের স্থায়িত্বই একে বিকল্প মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এছাড়া, বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও কর্পোরেট হাউসগুলো এখন স্বর্ণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এই প্রবণতাটি এক ধরনের সংক্রামক প্রভাব তৈরি করেছে। একজন বিনিয়োগকারী যখন স্বর্ণ কিনছে, অন্যরাও সেটিকে নিরাপদ সিদ্ধান্ত ভেবে অনুসরণ করছে। ফলে বাজারে স্বর্ণের চাহিদা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, যা দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি করছে। বাজার বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরের শেষ নাগাদ স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্সে ৫০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর অর্থ হলো, পৃথিবী যতই ডিজিটাল বা ভার্চুয়াল হোক না কেন, মানুষ এখনো সেই পুরনো বিশ্বস্ত বস্তুগত সম্পদের প্রতি আস্থা রাখে। এমনকি চীন এবং রাশিয়া ২০২২ সালেই গোপনে ৪০০ টন স্বর্ণ কিনেছিল, যার লক্ষ্য ছিল স্বর্ণ মানের ওপর ভিত্তি করে নতুন রিজার্ভ কারেন্সি তৈরি করা। স্বর্ণমজুদের এই পরিমাণ দিন দিন আরও বাড়ছে। এই সব কিছু প্রমাণ করে, আমরা এক নতুন অর্থনৈতিক যুগে প্রবেশ করছি, যেখানে স্বর্ণের নীরব ভাষা পৃথিবীর অর্থনীতি ও রাজনীতিকে নতুন করে নিয়ন্ত্রণ করছে।

কোন মন্তব্য নেই