কেন আমেরিকায় সামরিক অভ্যুত্থান হয় না | সামরিক অভ্যুত্থান অসম্ভব হওয়ার কারণ
একবার
চারপাশের পৃথিবীর দিকে তাকান—থাইল্যান্ড,
মিয়ানমার, পাকিস্তান, সুদান, চিলি বা আর্জেন্টিনা—ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই আপনি
এমন অগণিত দেশের নাম পাবেন যেখানে
সামরিক অভ্যুত্থান বা 'কু' হলো
এক নির্মম এবং বারবার ফিরে
আসা বাস্তবতা। যেখানে সামরিক ট্যাংকগুলো এক সকালে রাষ্ট্রপতির
বাসভবন ঘিরে ধরে, জেনারেলরা
টেলিভিশনে এসে সংবিধান স্থগিত
করার ঘোষণা দেন, আর জনগণের
নির্বাচিত সরকারকে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতাচ্যুত
করা হয়। সামরিক অভ্যুত্থান
বিশ্ব রাজনীতির এক চিরাচরিত দৃশ্য।
এবার আমরা দৃষ্টি ফেরাবো
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। দেশটি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে
উন্নত সামরিক বাহিনীর অধিকারী। তাদের যুদ্ধবিমান, রণতরি এবং সৈন্যরা বিশ্বের
প্রতিটি কোণে মোতায়েন রয়েছে।
তত্ত্বগতভাবে দেখলে, তাদের সামরিক শক্তি এতটাই অপ্রতিরোধ্য যে, তারা যদি
চায়, তবে দেশের যেকোনো
নির্বাচিত সরকারকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত করে দিতে পারে।
কিন্তু অবাক করা বিষয়
হলো, প্রায় ২৫০ বছরের ইতিহাসে,
এমনকি গৃহযুদ্ধের মতো ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ
সংঘাতের পরেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কখনোই কোনো সফল সামরিক
অভ্যুত্থান ঘটেনি। এমনকি অভ্যুত্থানের কোনো গুরুতর ষড়যন্ত্র
বা প্রচেষ্টারও কথা শোনা যায়নি।
যে দেশটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার পরিবর্তনে প্রায়শই অভিযুক্ত হয়, সেই দেশটি
নিজের সরকারের স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে তার সামরিক বাহিনীর
হাতে কখনোই হুমকির সম্মুখীন হয়নি। কিন্তু কেন? মার্কিন গণতন্ত্রকে
তার নিজের সেনাবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা
করার জন্য কোন অদৃশ্য
বর্ম বা প্রাচীর কাজ
করে? দেশটির প্রতিষ্ঠাতারা কীভাবে এমন একটি ব্যবস্থা
তৈরি করেছিলেন যা নিশ্চিত করে
যে সামরিক তরবারিটি সর্বদা কলমের অনুগত থাকবে? কোন প্রাতিষ্ঠানিক, সাংস্কৃতিক
এবং পেশাগত কারণগুলো মার্কিন জেনারেলদেরকে তাদের বেড়াকে থাকতে এবং নির্বাচিত নেতাদের
নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য
করে?
এই জটিল প্রশ্নের উত্তর
লুকিয়ে আছে আমেরিকার জন্মলগ্নে,
তার প্রতিষ্ঠাতা বা জাতির পিতাদের
গভীর রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে। জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস
জেফারসন, জেমস ম্যাডিসন—এঁরা
সকলেই ছিলেন ইউরোপীয় ইতিহাসের একনিষ্ঠ ছাত্র। তাঁরা দেখেছিলেন কীভাবে প্রাচীন রোমান প্রজাতন্ত্রে জুলিয়াস সিজারের মতো জেনারেলরা তাঁদের
সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখল
করেছিলেন এবং কীভাবে ইংল্যান্ডে
অলিভার ক্রোমওয়েলের মতো সামরিক নেতারা
নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটিয়ে সৈরতন্ত্র
প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার
ফলস্বরূপ, তাঁরা একটি স্থায়ী, শক্তিশালী
সেনাবাহিনীর ধারণার প্রতি এক গভীর অবিশ্বাস
এবং ভীতি পোষণ করতেন।
তাঁরা মনে করতেন যে
একটি বড় আকারের পেশাদার
সেনাবাহিনী হলো প্রজাতান্ত্রিক বা
রিপাবলিকান স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে বড়
হুমকি। কারণ, এর শক্তি এবং
শৃঙ্খলা খুব সহজেই একজন
উচ্চাভিলাষী জেনারেলকে সৈরশাসকে পরিণত করতে পারে। এই
গভীর অবিশ্বাস থেকেই তাঁরা মার্কিন সংবিধান এবং শাসন ব্যবস্থার
প্রতিটি স্তরে এমন এক দূরদর্শী
কাঠামো তৈরি করেন, যা
সামরিক বাহিনীকে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখতে
বাধ্য।
যেমন,
মার্কিন সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ (Article Two) পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করে যে দেশের
সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বা কমান্ডার ইন
চিফ হলেন রাষ্ট্রপতি—অর্থাৎ
একজন নির্বাচিত বেসামরিক নেতা। এর মানে হলো
সামরিক বাহিনীর চূড়ান্ত আদেশটি একজন রাজনীতিবিদের কাছ
থেকে আসে, যিনি জনগণের
কাছে দায়বদ্ধ। কোনো জেনারেল বা
অ্যাডমিরাল যদি রাষ্ট্রপতির আদেশ
অমান্য করেন, তবে তা সরাসরি
রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু
প্রতিষ্ঠাতারা শুধু রাষ্ট্রপতির একক
ক্ষমতার ওপরও ভরসা করেননি;
তাঁরা ক্ষমতাকে আরও বিভক্ত করে
দেন। সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদ (Article One) অনুযায়ী, একমাত্র কংগ্রেসেরই যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা রয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কংগ্রেসের হাতেই
রয়েছে 'পাওয়ার অফ দ্য পার্স'
বা কোষাগারের চাবি। একমাত্র কংগ্রেসই সামরিক বাহিনীর জন্য বাজেট অনুমোদন
করতে পারে, সৈন্য সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারে এবং
নতুন অস্ত্রশস্ত্র কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ
করতে পারে। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীর জন্য কোনো অর্থ
বরাদ্দই দুই বছরের বেশি
সময়ের জন্য হতে পারে
না। এর ফলে সামরিক
বাহিনীকে তাদের অস্তিত্ব এবং রসদের জন্য
প্রতিনিয়ত নির্বাচিত আইনসভার (কংগ্রেস) উপর নির্ভর করতে
হয়।
এছাড়াও,
সামরিক শক্তিকে কেন্দ্রীভূত না করে জনগণের
হাতে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি মূল দর্শন
ছিল। যদিও বর্তমানে ব্যক্তিগত
আগ্নেয়াস্ত্রের মালিকানা নিয়ে দ্বিতীয় সংশোধনী (Second Amendment) সমালোচিত হয়, কিন্তু এর
মূল প্রেক্ষাপট ছিল একটি স্থায়ী
সেনাবাহিনীর প্রতি অবিশ্বাস। প্রতিষ্ঠাতারা চেয়েছিলেন যে দেশের প্রতিরক্ষার
মূল ভিত্তি হবে সুসংগঠিত গণবাহিনী
বা 'ওয়েল রেগুলেটেড মিলিশিয়া', যা সাধারণ নাগরিকদের
নিয়ে গঠিত হবে। তাঁদের
ধারণা ছিল, একটি সশস্ত্র
নাগরিক সমাজ সৈরাচার এবং
একটি দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রক্ষাকবজ হবে। এই সাংবিধানিক
বর্ম—রাষ্ট্রপতির বেসামরিক নেতৃত্ব, কংগ্রেসের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ—এমন একটি শক্তিশালী
ভিত্তি তৈরি করেছে যা
নিশ্চিত করে যে মার্কিন
সামরিক বাহিনী সবসময়ই রাষ্ট্রের একটি হাতিয়ার হিসেবে
কাজ করবে, রাষ্ট্রের প্রভু হিসেবে নয়।
এই সাংবিধানিক সুরক্ষা কবচের পাশাপাশি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভ্যুত্থানকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে সশস্ত্র
শক্তিগুলোর এক জটিল এবং
ইচ্ছাকৃত বিকেন্দ্রীভূত কাঠামো। পৃথিবীর অনেক দেশেই সামরিক
বাহিনী একটি একক, কেন্দ্রীভূত
এবং সমজাতীয় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সশস্ত্র শক্তিকে এমনভাবে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে
রাখা হয়েছে যে তাদের পক্ষে
একত্রিত হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে
একটি সমন্বিত অভিযান চালানো প্রায় অকল্পনীয়। মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী কোনো একক প্রতিষ্ঠান
নয়। এটি বর্তমানে ছয়টি
ভিন্ন ভিন্ন শাখা নিয়ে গঠিত:
আর্মি (স্থলবাহিনী), নেভি (নৌবাহিনী), এয়ারফোর্স (বিমান বাহিনী), মেরিন কোর, স্পেসফোর্স এবং
কোস্ট গার্ড। প্রতিটি শাখার নিজস্ব কমান্ড স্ট্রাকচার, নিজস্ব বাজেট, নিজস্ব সংস্কৃতি এবং প্রায়ই নিজস্ব
প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ থাকে। ঐতিহাসিকভাবেই এই শাখাগুলোর মধ্যে
এক ধরনের স্বাস্থ্যকর এবং কখনো কখনো
অস্বাস্থ্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে আসছে। আর্মির
একজন জেনারেলের পক্ষে নেভির একজন অ্যাডমিরাল বা
এয়ারফোর্সের একজন জেনারেলকে দিয়ে
কোনো অভ্যুত্থানের পক্ষে কাজ করানো প্রায়
অসম্ভব। পেন্টাগনের ভেতরের এই প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন
এবং ক্ষমতার ভারসাম্য যেকোনো একক শাখার পক্ষে
পুরো সামরিক যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করাকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে।
এই সামরিক কাঠামোর সবচেয়ে অনন্য উপাদানগুলোর মধ্যে একটি হলো ন্যাশনাল
গার্ড। ন্যাশনাল গার্ড কোনো ফেডারেল বা
কেন্দ্রীয় বাহিনী নয়, এটি মূলত
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনী। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশনাল গার্ডের কমান্ডার হলেন সেই রাজ্যের
গভর্নর—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নন। এর মানে
হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পঞ্চাশটি ভিন্ন ভিন্ন ন্যাশনাল গার্ড ইউনিট রয়েছে, যারা পঞ্চাশ জন
ভিন্ন ভিন্ন গভর্নরের অধীনে কাজ করে। যদিও
রাষ্ট্রপতি ফেডারেল প্রয়োজনে ন্যাশনাল গার্ডকে সক্রিয় করতে পারেন, কিন্তু
স্বাভাবিক অবস্থায় তারা রাজ্য সরকারের
নিয়ন্ত্রণে থাকে। যদি ফেডারেল সেনাবাহিনীর
কোনো অংশ বিদ্রোহ করে,
তবে বিভিন্ন রাজ্যের গভর্নররা তাদের ন্যাশনাল গার্ডকে সেই বিদ্রোহ দমনের
জন্য ব্যবহার করতে পারেন। এই
ব্যবস্থাটি সামরিক শক্তিকে ওয়াশিংটন ডিসির বাইরে রাজ্যের হাতে ছড়িয়ে দিয়ে
ক্ষমতার এক অসাধারণ বিকেন্দ্রীকরণ
ঘটায়।
সামরিক
বাহিনীর বাইরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র শক্তির এক বিশাল এবং
বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে যা বেসামরিক নিয়ন্ত্রণে
কাজ করে। যেমন, ডিপার্টমেন্ট
অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস), ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই),
ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ)-এর মতো অসংখ্য
ফেডারেল এজেন্সির নিজস্ব সশস্ত্র ইউনিট রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব পুলিশ বাহিনী, প্রতিটি কাউন্টির শেরিফ ডিপার্টমেন্ট এবং প্রতিটি শহরের
নিজস্ব পুলিশ ডিপার্টমেন্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৮,০০০ ভিন্ন
ভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা
রয়েছে। এই জটিল এবং
বহুস্তরীয় কাঠামোটি নিশ্চিত করে যে মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র শক্তির কোনো একক কেন্দ্রবিন্দু
নেই। একটি অভ্যুত্থান সফল
করতে হলে ষড়যন্ত্রকারীদেরকে শুধুমাত্র সেনাবাহিনীর
বিভিন্ন শাখার মধ্যে সমন্বয় করতে হবে না,
বরং তাদের ন্যাশনাল গার্ড এবং হাজার হাজার
স্বাধীন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার
সম্ভাব্য প্রতিরোধকেও মোকাবেলা করতে হবে। এই
কাঠামোগত বিভাজনই হলো অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে
আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী বাস্তব প্রতিবন্ধকতা।
কিন্তু
সাংবিধানিক আইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক
কাঠামোর চেয়েও হয়তো বেশি শক্তিশালী হলো
সেই অদৃশ্য প্রাচীর যা মার্কিন সামরিক
বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের মনের ভেতরে তৈরি
করা হয়। এটি হলো
তাদের পেশাগত নীতিশাস্ত্র, সংস্কৃতি এবং আদর্শের প্রাচীর,
যা তাদেরকে বেসামরিক শাসনের প্রতি অনুগত থাকতে শেখায়। আর্মির ওয়েস্ট পয়েন্ট, নেভির আনাপুলিস বা এয়ারফোর্সের কলোরাডো
স্প্রিংস-এর মতো বিশ্বমানের
সামরিক অ্যাকাডেমিগুলোতে ক্যাডেটদেরকে শুধুমাত্র যুদ্ধের কৌশলই শেখানো হয় না, বরং
তাদের মাথার মধ্যে 'সিভিলিয়ান কন্ট্রোল' বা বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের
ধারণাটিকে একেবারে গেঁথে দেওয়া হয়। তাদের শেখানো
হয়েছে যে একজন সৈন্যের
কাজ হলো নীতি নির্ধারণ
করা নয়, বরং নির্বাচিত
বেসামরিক নেতাদের দ্বারা নির্ধারিত নীতিকে কার্যকর করা। তাদের শেখানো
হয়েছে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা হলো দেশের সেবা
করা, দেশ শাসন করা
নয়।
এই পেশাদারিত্বের ধারণাটি মার্কিন সামরিক সংস্কৃতির একেবারে মূলে অবস্থিত। মার্কিন
সামরিক বাহিনীর প্রতিটি সদস্য, সাধারণ সৈনিক থেকে শুরু করে
সর্বোচ্চ পদের জেনারেল পর্যন্ত,
একটি গুরুত্বপূর্ণ শপথ গ্রহণ করে
তাদের কর্মজীবন শুরু করেন। তারা
কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রপতি, কোনো জেনারেল বা
কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের
শপথ নেয় না। তারা
শপথ নেয়, "টু সাপোর্ট অ্যান্ড
ডিফেন্ড দ্য কনস্টিটিউশন অফ
ইউনাইটেড স্টেটস এগেইনস্ট অল এনিমিজ, ফরেইন
অ্যান্ড ডমেস্টিক"—অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানকে সকল শত্রু, বিদেশী
এবং অভ্যন্তরীণ উভয়ের হাত থেকে সমর্থন
ও রক্ষা করার জন্য। এই
শপথের 'ডমেস্টিক এনিমিজ' বা অভ্যন্তরীণ শত্রু
শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দ্বারা বোঝানো
হয়েছে যে যদি দেশের
ভেতরে থেকেও কেউ—এমনকি সরকারের
উচ্চপদস্থ কোনো ব্যক্তিও—সংবিধানকে
লঙ্ঘন করার চেষ্টা করে,
তবে সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব হলো সংবিধানকে রক্ষা
করা, সেই ব্যক্তিকে নয়।
এই শপথ সামরিক বাহিনীকে
একটি অরাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক রক্ষকের
ভূমিকায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
আমেরিকান
সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত আছে 'আমেরিকান এক্সেপশনালিজম'
বা আমেরিকান ব্যতিক্রমবাদ নামে একটি ধারণা।
এটি হলো সেই বিশ্বাস
যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো থেকে আলাদা এবং
শ্রেষ্ঠ, কারণ এটি স্বাধীনতা,
গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের
নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। এই
ধারণা অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সামরিক অভ্যুত্থান
কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনই
নয়, এটি হবে সেই
মৌলিক আদর্শের মৃত্যু, যা আমেরিকাকে আমেরিকা
বানিয়েছে। এই সাংস্কৃতিক বিশ্বাসটি
সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও গভীরভাবে রয়েছে, ফলে একটি অভ্যুত্থানের
ধারণাকে তারা একটি অকল্পনীয়
এবং প্রায় দেশদ্রোহিতামূলক কাজ হিসেবেই বিশ্বাস
করে। এছাড়াও, মার্কিন সামরিক বাহিনী দেশটির মতোই এক বৈচিত্রময়
প্রতিষ্ঠান। এর সদস্যরা সমাজের
সকল স্তর, সকল জাতি, ধর্ম
এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে আসে। এই
বৈচিত্র্য সামরিক বাহিনীর ভেতরে এমন কোনো একক
সমজাতীয় গোষ্ঠীর উদ্ভব হতে বাধা দেয়,
যারা হয়তো নিজেদেরকে দেশের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে ভাবতে পারে এবং ক্ষমতা
দখলের চেষ্টা করতে পারে। এই
সাংস্কৃতিক এবং আদর্শিক ভিত্তিই
হলো সেই অদৃশ্য শক্তি
যা মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সংবিধানের সীমার মধ্যে থাকতে বাধ্য করে।
কিন্তু
এই বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাটি এতটাই শক্তিশালী বলে এর মানে
এই নয় যে বেসামরিক
নেতা এবং সামরিক জেনারেলদের
মধ্যে কখনোই কোনো সংঘাত বা
মতবিরোধ হয়নি। বরং মার্কিন ইতিহাস
এই ধরনের টানাপোড়েনের ঘটনায় পূর্ণ, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই সংঘাতগুলো সাংবিধানিক
কাঠামোর ভেতরে সমাধান হয়েছে—বন্দুকের নলের মুখে নয়।
মার্কিন গৃহযুদ্ধের সময় ইউনিয়ন আর্মির
কমান্ডার জেনারেল জর্জ বি. ম্যাকলিলন
ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক,
কিন্তু ফিল্ডে দ্বিধাগ্রস্ত কমান্ডার। তিনি প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম
লিংকনের যুদ্ধকৌশলের তীব্র সমালোচক ছিলেন এবং প্রায়ই প্রেসিডেন্টের
সরাসরি আদেশ পালন করতে
দ্বিধা করতেন। ম্যাকলিলন ব্যক্তিগতভাবে লিংকনকে একজন অযোগ্য নেতা
বলেও মনে করতেন এবং
এমনকি তাঁর রাষ্ট্রপতি পদে
প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু তাঁর
সমস্ত অসম্মতি বা সমালোচনা সত্ত্বেও,
তিনি কখনোই তাঁর সেনাবাহিনীকে ওয়াশিংটনের
দিকে চালনা করার কথা ভাবেননি।
শেষ পর্যন্ত, লিংকন তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা
ব্যবহার করে ম্যাকলিলানকে তাঁর
পদ থেকে বরখাস্ত করেন,
যা প্রমাণ করে যায় যুদ্ধের
মাঝেও নির্বাচিত বেসামরিক নেতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
আরও
একটি বিখ্যাত উদাহরণ হলো কোরিয়ান যুদ্ধের
সময়কার ঘটনা। জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার ছিলেন কিংবদন্তী তুল্য এবং অত্যন্ত জনপ্রিয়
সামরিক কমান্ডার। কিন্তু তিনি প্রেসিডেন্ট হ্যারি
ট্রুম্যানের যুদ্ধ সীমিত রাখার নীতির সাথে প্রকাশ্যে দ্বিমত
পোষণ করেন। ম্যাকআর্থার চীনে পারমাণবিক বোমা
হামলাসহ যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করার
পক্ষে ছিলেন। তিনি কংগ্রেসের নেতাদের
কাছে চিঠি লিখে এবং
গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে প্রেসিডেন্টের নীতির সমালোচনা করতে শুরু করেন,
যা ছিল কমান্ডার ইন
চিফের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত ১৯৫১
সালের এপ্রিলে, ট্রু ম্যান এক
অত্যন্ত সাহসী এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
নেন—তিনি আমেরিকার সবচেয়ে
জনপ্রিয় জেনারেলকে তাঁর পদ থেকে
বরখাস্ত করেন। ট্রুম্যান স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে তিনি ম্যাকআর্থারকে
বরখাস্ত করেছেন কারণ তিনি দেশের
সংবিধানের অবমাননা করেছেন। ট্রুম্যান আরও বলেছিলেন যে
কোনো থিয়েটার কমান্ডারের দ্বারা তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হতে দিতে পারেন
না। এই ঘটনাটি ছিল
মার্কিন ইতিহাসে বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের নীতির সবচেয়ে শক্তিশালী এবং দ্যর্থহীন প্রয়োগ।
এটি প্রমাণ করে যে কোনো
জেনারেল, তিনি যতই জনপ্রিয়
বা বীর হোন না
কেন, তিনি আইনের ঊর্ধ্বে
নন। সাম্প্রতিক ইতিহাসেও এই টানাপোড়েনগুলো দেখা
গেছে: ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় জনসন প্রশাসনের
সাথে পেন্টাগনের মতবিরোধ ছিল, আর আফগানিস্তান
যুদ্ধের সময় জেনারেল স্ট্যানলি
ম্যাকক্রিস্টাল রোলিংস্টোন ম্যাগাজিনে ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমালোচনা করার পর তাকে
পদত্যাগ করতে বাধ্য করা
হয়েছিল। অতি সম্প্রতি, ডোনাল্ড
ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্বের শেষ দিনগুলোতে, জয়েন্ট
চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান
জেনারেল মার্ক মিলি রাষ্ট্রপতির কিছু
সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং পারমাণবিক অস্ত্রের
ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার মতো
পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
এই সমস্ত ঘটনাগুলো দেখায় যে বেসামরিক ও
সামরিক সম্পর্ক সবসময় মসৃণ নয়, কিন্তু
এই টানা বোরেনগুলো বরাবরই
রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার
মধ্যে সমাধান হয়েছে, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নয়।
মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে যে ঐতিহাসিক এবং
কাঠামোগত রক্ষা কবজগুলো রয়েছে, তা নিঃসন্দেহে শক্তিশালী।
কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক আমেরিকা এমন কিছু নতুন
চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে যা এই রক্ষাকবজগুলোর
স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন
তুলেছে। মার্কিন সমাজ এবং রাজনীতি
আজ এক অভূতপূর্ব মেরুকরণের
শিকার। ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানদের মধ্যকার
বিভাজন শুধুমাত্র নীতিগত মতপার্থক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পরিণত
হয়েছে এক গভীর সাংস্কৃতিক
এবং আদর্শিক সংঘাতে। এই তীব্র মেরুকরণ
সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতোই সামরিক বাহিনীকেও
প্রভাবিত করছে। সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও মানুষ এবং তাদেরও নিজস্ব
রাজনৈতিক বিশ্বাস রয়েছে। যখন দেশের রাজনৈতিক
নেতারা একে অপরকে শত্রু
হিসেবে চিহ্নিত করে এবং গণতান্ত্রিক
প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন সামরিক বাহিনীর
জন্য অরাজনৈতিক থাকাটা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক
বছরগুলোতে মার্কিন জনগণ এবং রাজনৈতিক
নেতাদের মধ্যে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান—যেমন নির্বাচন ব্যবস্থা,
বিচার বিভাগ এবং গণমাধ্যমের প্রতি
আস্থা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই আস্থার অবক্ষয়
একটি বিপদজনক শূন্যতা তৈরি করে। যখন
জনগণ এবং নেতারা গণতান্ত্রিক
প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে না, তখন
তারা হয়তো বিকল্প অগণতান্ত্রিক সমাধানের দিকে ঝুঁকতে পারে,
যার মধ্যে সামরিক হস্তক্ষেপও একটি। আবার কিছু রাজনৈতিক
নেতা সামরিক বাহিনীকে তাঁদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন,
যা একটি বিপদজনক প্রবণতা।
সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক সমাবেশে ব্যবহার করা বা জেনারেলদেরকে
রাজনৈতিক বিতর্কে টেনে আনার চেষ্টা
সামরিক বাহিনীর অরাজনৈতিক চরিত্রকে ক্ষুণ্ন করে। যখন সামরিক
বাহিনী কোনো একটি নির্দিষ্ট
রাজনৈতিক দলের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে
যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন
অন্য দলের অধীনে কাজ
করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে
যায়, যা বেসামরিক সামরিক
সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে নষ্ট করে দেয়।
এদিকে
পেন্টাগন নিজেও স্বীকার করেছে যে সামরিক বাহিনীর
ভেতরে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী এবং অন্যান্য চরমপন্থী
গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা।
এই গোষ্ঠীগুলো মার্কিন সংবিধানের প্রতি অনুগত নয়, বরং তারা
একটি নির্দিষ্ট বর্ণবাদী বা স্বৈরাচারী মতাদর্শের
প্রতি অনুগত। যদিও তাদের সংখ্যা
এখনো খুবই কম, কিন্তু
তাদের উপস্থিতি সামরিক বাহিনীর ঐক্য এবং শৃঙ্খলার
জন্য এক গুরুতর হুমকি।
২০২১ সালের ৬ই জানুয়ারি মার্কিন
ক্যাপিটলে হামলার ঘটনাটি ছিল মার্কিন গণতন্ত্রের
উপর এক সরাসরি আক্রমণ।
এই ঘটনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন সদস্য বা ভেটারান এবং
এমনকি কিছু কর্মরত সদস্যও
ছিলেন। যদিও এটি কোনো
সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না এবং
সামরিক নেতৃত্ব দ্রুত এই ঘটনার নিন্দা
জানিয়েছিল, কিন্তু এটি দেখিয়ে দিয়েছে
যে দেশের রাজনৈতিক বিভাজন কতটা গভীরে প্রবেশ
করেছে এবং সামরিক বাহিনীর
কিছু সদস্যও এই চরমপন্থী ধারণার
দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। এই
চ্যালেঞ্জগুলো ইঙ্গিত দেয় না যে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সামরিক অভ্যুত্থান
আসন্ন, কিন্তু এগুলো থেকে ধারণা করা
যায় যে ঐতিহাসিক এবং
সাংস্কৃতিক ভিত্তিগুলো মার্কিন গণতন্ত্রকে রক্ষা করে এসেছে, সেগুলো
আর আগের মতো অভেদ্য
নেই।

কোন মন্তব্য নেই