নিহিলিজম কী? জীবনকে অর্থহীন ভাবার দর্শনের গভীর বিশ্লেষণ
বন্ধুরা, জীবনে আমরা প্রত্যেকেই কিছু না কিছু উদ্দেশ্য নিয়ে বাঁচি, তাই না? যেমন ধরুন, পড়াশোনা করি পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য, ভালো ফল পেলে হয়তো একটা দারুণ চাকরি পাবো। আর সেই চাকরিতে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে টাকা কামাই করি কেন? বর্তমান আর ভবিষ্যৎটা একটু সুন্দর করে তোলার জন্য। আমরা হয়তো নামাজ পড়ি কিংবা পূজা করি এই আশায় যে পরকালে স্বর্গ বা জান্নাত নিশ্চিত হবে। কাউকে ভালোবাসলে তার মন জয় করার জন্য অক্লান্ত চেষ্টা করি, যাতে সারাজীবনের জন্য তাকে পাশে পাই। সন্তানকে সেরা স্কুলে পাঠাই, সুন্দর পরিবেশ দিই, যাতে তারা সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে পারে। আমাদের প্রতিটি কাজের পেছনেই একটা আকাঙ্ক্ষা থাকে, একটা ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা থাকে। এটা খুবই স্বাভাবিক। কাজটা ঠিকমতো না করলে ফলাফল খারাপ হবে, এটাই তো নিয়ম।
কিন্তু একবার ভাবুন তো, যদি কোনোদিন কেউ আপনাকে এসে বলে, আপনার এই সমস্ত চেষ্টা, এত পরিশ্রম, এত কষ্ট – সবকিছুই আসলে অর্থহীন? শুনতে নিশ্চয়ই আপনার প্রতিবাদী মন জেগে উঠবে, তাই না? হয়তো পাল্টা যুক্তি দেবেন। কিন্তু সেও কি আরও গভীর যুক্তি দিয়ে বলতে পারে না যে, ভালো মার্কস পেলেই কি ভালো চাকরি পাওয়া নিশ্চিত? অফিসে সেরা পারফরমেন্স দিয়েও কি প্রমোশন না পাওয়ার সম্ভাবনা নেই? সারাজীবনের সঞ্চয় এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে যেতে পারে ব্যাংক লুটের মতো কোনো ঘটনায়। সন্তানের পেছনে দেওয়া সব শ্রম কি পণ্ড হয়ে যেতে পারে না? সন্তান বিপথে যেতেই পারে। হ্যাঁ, যুক্তির পাল্লায় সবকিছুই তো ঘটা সম্ভব। কিন্তু আমরা মানুষ তো বেঁচে থাকি আশায়, স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। তবুও কিছু মানুষ কেন শুধুই নৈরাশ্যকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে? সমাজবিজ্ঞানীরা এই চিন্তাভাবনার নাম দিয়েছেন নিহিলিজম।
নিহিলিজম – এমন একটা দর্শন যেখানে আশার কোনো জায়গা নেই, আবেগের কোনো স্থান নেই। যেখানে যুক্তিই শেষ কথা। সেসব যুক্তি হয়তো আপনি মানতে চাইবেন না, কিন্তু উড়িয়েও দিতে পারবেন না। নিহিলিজম শুধু শূন্যবাদ বা নৈরাশ্যবাদেরই কথা বলে না, অনেকেই একে ধ্বংসবাদ বলেও অভিহিত করেন। শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ 'নেহিল' থেকে, যার অর্থ হলো 'কিছুই না'। মূলত, নিহিলিজম এমন এক দার্শনিক মতবাদ যা প্রচার করে যে জীবনের কোনো বিশেষ অর্থ, গুরুত্ব বা উদ্দেশ্য নেই। নৈতিকতা বা নীতিগত মূল্যবোধের কোনো সুবিধাও এখানে দেখা যায় না। আমাদের জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক – দিনশেষে সবকিছুই সমাজ-সৃষ্ট নীতিবিদ্যার কাছে বিমূর্ত ও অকার্যকর। আর এটাই হলো নিহিলিজমের মূল মন্ত্র। যারা এই মন্ত্রে বিশ্বাস করে, তাদের বলা হয় নিহিলিস্ট। তবে আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকা যদি আপনার "কী হয়েছে?" প্রশ্নের উত্তরে বারবার "কিছুই না" বলে, তাহলে তাকে কিন্তু নিহিলিজমের অনুসারী ভাবার দরকার নেই, কারণ নিহিলিজম তার চেয়ে অনেক কঠিন ও গভীর একটা বিষয়।
নিহিলিজম বলে যে মানুষ শূন্য থেকে এসেছে এবং একদিন শূন্যেই মিলিয়ে যাবে। শুধু মানুষ নয়, এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিও শূন্য থেকেই হয়েছে বলে নিহিলিজম বিশ্বাস করে। মানবজীবন এবং এর প্রতিটি কাজই সম্পূর্ণ অর্থহীন। মানুষ শুধু শুধুই সফল হওয়ার পেছনে ছোটে, টাকার পেছনে ঘোরে, সংসার পেতে সন্তানের জন্ম দেয়, বয়স বাড়ে আর একদিন হঠাৎ করেই মরে যায়। জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানের এই সব প্রক্রিয়াকেই নিহিলিজম অর্থহীন বলে চিহ্নিত করে।
এই চিন্তাধারার বয়স খুব বেশি দিনের নয়। নিহিলিজমের উদ্ভব ঘটেছিল মূলত ১৯ শতকের ইউরোপে। রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের শাসনকালে তার বিরোধী একটি বিপ্লবী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল, যারা যুক্তিবাদ এবং ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিল। তারা সব রকমের কর্তৃত্ববাদের বিরোধী ছিল এবং ক্যাথলিক চার্চের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে দিতে চেয়েছিল। তাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল সাম্যবাদী একটি রাষ্ট্র, যেখানে বর্ণ, ধর্ম, ধনী-গরিব বা শিক্ষিত-অশিক্ষিতের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। আইভান টারজেনাভের ১৮৬২ সালের উপন্যাস 'ফাদারস অ্যান্ড সন্স'-এ নিহিলিজম শব্দটির প্রথম দেখা মেলে, যেখানে জেভজেনি বাজেরভ নামের চরিত্রকে একজন নিহিলিস্ট হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৬ শতকেই গৌতম বুদ্ধকে এর জনক হিসেবে ধরা হয়। ভারতীয় দর্শন চিন্তায় সন্ন্যাসবাদ বা রিনানশিয়েশনের একটি পাকাপাকি অবস্থান বরাবরই ছিল। শ্রীমদ্ভাগবতগীতায় বলা হচ্ছে যে, যিনি সমস্ত কামনা-বাসনা ত্যাগ করে, জড় বিষয়ের প্রতি নিস্পৃহ, নিরহংকার ও মমত্ববোধ রহিত হয়ে বিচরণ করেন, তিনিই প্রকৃত শান্তি লাভ করেন। প্রাচ্যে নিহিলিজমের অর্থ আরও ব্যাপক। সেখানে বলা হচ্ছে, "ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা"। আর যেহেতু ব্রহ্ম আকারবিহীন এক অরূপ সত্তা, তাই সবকিছু শূন্য। কিন্তু পাশ্চাত্যে, যখন একজন ব্যক্তি জীবনের অর্থহীনতার কথা বলেন, তখন তা জীবনের বিচ্ছিন্নতার অংশ হিসেবে ধরা হয়, যার মূল কারণ নিজের উৎপাদিত ফলাফল থেকে নিজে বঞ্চিত হওয়া।
তবে এই নিহিলিজমকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ নিটশে। এই ভদ্রলোকই দম্ভের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, "স্রষ্টা বলে কিছু নেই, আমরা নিজেরাই স্রষ্টাকে হত্যা করেছি"। অনেকেই তাকে বদ্ধ উন্মাদ বা পাগল ভাবলেও, ইউরোপের অভিজাত সমাজের অনেকেই কিন্তু তার চিন্তাভাবনাকে উপেক্ষা করতে পারেননি। মজার ব্যাপার হলো, নিটশে নিজেই এই নিহিলিজমে বিশ্বাসী ছিলেন কিনা, তা কিন্তু পরিষ্কারভাবে কোথাও পাওয়া যায় না। বরং, নিটশে মনে করতেন, নিহিলিজম মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের একটি পর্যায় মাত্র। যখন মানুষ প্রচন্ড নিঃসঙ্গতায় ভোগে, তখন তারা প্রচলিত নীতি-নৈতিকতা এবং সত্যের প্রতি বিমুখ হতে থাকে। অসীম হতাশা মানুষের কাছে সবকিছুকে অর্থহীন করে তোলে। নিটশের মতে, এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর উদ্দেশ্যহীনতায় ভোগা পর্যায়টি মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ মানুষ ততদিন নতুন কোনো নিয়ম প্রবর্তন করবে না, যতদিন না পুরাতনের প্রতি তার বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে যায়।
নিটশে নিহিলিজমকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমটি হলো প্যাসিভ নিহিলিজম। এই পর্যায়ে মানুষের বিশ্বাস ধীরে ধীরে কমতে থাকে, এবং সে তখন শূন্যের দিকে ধাবমান হয়। তার পজিটিভ এনার্জি কমে যায়, ইচ্ছাশক্তি হয় ক্রমশ বিলীন। একজন প্যাসিভ নিহিলিস্টের কাছে যখন সবকিছু অর্থহীন হয়ে পড়ে, তখন সে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। জীবনের সব ধরনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, সামাজিক বিশ্বাস আর অভিপ্রায় হারিয়ে সে সব রকম দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। এই প্রক্রিয়ায় একসময় সে প্রথাগত সমাজ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেয়। নিটশে এই ধরনের শূন্যবাদকে মদ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার সাথে তুলনা করেছেন। কারণ তার মতে, প্রচলিত রীতিনীতির উপর কেবল বিশ্বাস হারিয়ে সেগুলোর পুনর্বিবেচনা না করে নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা কোনো সমাধান হতে পারে না।
আরেক ধরনের নিহিলিজমের কথা নিটশে বলেছেন, যেটির নাম তিনি দিয়েছেন অ্যাক্টিভ নিহিলিজম। একজন অ্যাক্টিভ নিহিলিস্টের মধ্যে প্যাসিভ নিহিলিজমের সব লক্ষণই থাকে। কিন্তু প্যাসিভ নিহিলিস্টের মতো তিনি হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেন না বা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান না। বরং তিনি সমাজের রীতিনীতিগুলোকে বদলে ফেলার মিশনে নামেন। সমাজের বিরুদ্ধে একরকমের যুদ্ধ ঘোষণা করে দেন। তার ইচ্ছাশক্তি প্রবল হয় এবং তার চোখে যেসব সামাজিক ধ্যান-ধারণা ও নীতি-নিয়মগুলোকে সমস্যাজনক মনে হয়, সেগুলোকে তিনি ভেঙে ফেলতে চান, তৈরি করতে চান নতুন নিয়ম, নতুন প্রথা। অ্যাক্টিভ নিহিলিজম নিয়ে নিটশে আরও বলেছেন, একজন ব্যক্তি যখন সক্রিয় শূন্যবাদী হয়ে উঠবেন, তখন তার কাছে ঈশ্বরের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। তার চোখে ঈশ্বর তখন মৃত, কারণ সে নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিয়েছে এবং নিজের জীবনধারা নিজে ঠিক করে নিচ্ছে। বিজ্ঞান এবং দর্শনের আলোকে সব ধরনের পবিত্র এবং অশরীরী বিশ্বাসকে সে নিজ হাতে হত্যা করেছে।
নিটশের সময়কাল বা তার পরের যারা নিহিলিজম নিয়ে গবেষণা করেছেন বা চর্চা করেছেন, তারা অ্যাক্টিভ এবং প্যাসিভের বাইরেও নিহিলিজমের আরও কিছু ধারা আবিষ্কার করেছেন। এর মধ্যে মোটামুটি তিনটি ধারাকে নিহিলিজমের মূল ধারা হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রথমটি হলো এক্সিস্টেন্সিয়াল নিহিলিজম, যা আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এক্সিস্টেন্সিয়াল নিহিলিজম বলে যে মানুষের আসলে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। ৭০ থেকে ৭৫ বছরের গড় আয়ু নিয়ে বিশ্বে যে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ বেঁচে আছে, এরা নাকি অযথা জীবন ধারণ করছে আর শুধুই অক্সিজেনের অপচয় করছে। অস্তিত্বমুখী শূন্যবাদ বলে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় মানুষ এবং তার কর্মপরিধি এতটাই ক্ষুদ্র, এতটাই নগণ্য যে সেটাকে গোনায় ধরার মতো কিছুই নেই। পৃথিবীর বয়স কয়েকশো কোটি বছর। সৃষ্টির আদি যুগ থেকে এই বিশ্বজগত নানামুখী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কত শত প্রাণী হাজার হাজার বছর ধরে ধরণীর বুকে বিচরণ করে আবার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। টিকে থাকার তাগিদে কত শত প্রাণী তাদের খোলস বদলে ফেলেছে। সেখানে ৬০ বা ৭০ বছর ধরে বেঁচে থাকা একটা মানুষের জীবন আসলে বালুকণার মতোই ক্ষুদ্র। গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলে এক্সিস্টেন্সিয়াল নিহিলিজমের এই ধারণা কিন্তু যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। ধরুন, আপনি একটি ভালো চাকরি করেন, বেতনও ভালো পান, আত্মীয় বা বন্ধুদের সার্কেলে আপনি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে এক্সিডেন্টে আপনার মৃত্যু হলো। তারপর কি রোজ সকালে সূর্য ওঠা বন্ধ হয়ে যাবে? চাঁদ কি আর আলো ছড়াবে না? ঋতু পরিবর্তন কি থেমে যাবে? আপনার জন্য পৃথিবীর বুকে কি জোয়ার-ভাটা আর হবে না? সবকিছুই যেমন চলছিল, ঠিক তেমনই চলবে – আপনাকে ছাড়াই চলবে। হ্যাঁ, কাছের কয়েকটা মানুষ হয়তো আপনার মৃত্যুতে শোক পালন করবে, আপনাকে মিস করবে। কিন্তু সেটাও বা কয়দিন? বিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ুও তো খুব বেশি হলে বড়জোর এক সপ্তাহ। বাবা-মা, ভালোবাসার মানুষ, আত্মীয়-স্বজন – কতদিনকেই তো আমরা হারাই। তাদের জন্য তো আমাদের জীবন থেমে যায় না। জীবন চলে তার নিজস্ব গতিতে, বেঁচে থাকার তাগিদে। আপনি বা আমি মারা গেলেও বাকিদের জীবন চলবে। সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ঘুরবে তার আপন গতিতে। পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড় সৌরজগৎ, তার চেয়েও বড় এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি, তার চেয়ে অনেক বড় গ্রহপুঞ্জ আর তার বাইরেও যে কত বড় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড – তার খোঁজও তো আমরা পাই না। সেখানে ছোট্ট অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ক্ষুদ্র সৌরজগতের পৃথিবী নামের সামান্য একটা গ্রহের বাংলাদেশ নামের পুঁচকে একটা দেশের নাগরিক হয়ে অনেক কিছু অর্জন করে ফেলেছি টাইপের যে আত্মগরিমায় আমরা ভুগি, সেটাকেই সপাটে চড় মেরেছে এক্সিস্টেন্সিয়াল নিহিলিজম।
নিহিলিজমের আরেকটি ধারার নাম হলো এপিস্টেমোলজিক্যাল নিহিলিজম। এই শূন্যবাদ জ্ঞানের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে। এপিস্টেমোলজিক্যাল নিহিলিজম বলে যে, জ্ঞান বলে কিছু নেই। যদি থেকেও থাকে, সেটা মানুষের আয়ত্তের বাইরে। এই ধারণার উদাহরণ দিতে গিয়ে নিহিলিস্টরা মূলত নিউটনের গ্রাভিটি বা মহাকর্ষ বল আবিষ্কারের ব্যাপারটাকে টেনে আনেন। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে মহাকর্ষ বল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। গাছের নিচে বসে থাকা নিউটনের মাথায় আপেল খসে পড়েছিল, আর তখনই যে মহাকর্ষ বল আবিষ্কার হয়েছিল, ব্যাপারটা এমন নয়। মহাকর্ষ বলের অস্তিত্ব সৃষ্টির আদি যুগ থেকেই ছিল। শুরু থেকেই আপেল গাছ থেকে নিচে পড়েছে, যে বস্তুর ভর এবং ওজন আছে তার গতি নিম্নমুখী ছিল। নিউটন সেটাকে খুঁজে বের করেছেন, পৃথিবীকে তার কারণ জানিয়েছেন সূত্রের মাধ্যমে, কাগজে-কলমে অভিকর্ষ বলের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন। নিউটন না করলেও, ১০, ২০ বা ৫০ বছর পরে কেউ না কেউ এই জিনিস ঠিকই খুঁজে বের করত। নিউটনের এই উদ্ভাবনের ফলে বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে, এটা যেমন সত্যি, ঠিক তেমনি সত্যি যে মানব সভ্যতা অনেক বেশি আধুনিক হওয়ার পরে, মানুষ প্রজাতির বয়স কয়েক কোটি বছর হয়ে যাওয়ার পরে এই বিষয়টা আবিষ্কার হয়েছে। আরও আগে যে হয়নি, এটাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখে এপিস্টেমোলজিক্যাল নিহিলিজম। এই ধারাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমাদের অজ্ঞতা আর অসারতা। স্কুল বা কলেজে আপনি যদি বিজ্ঞান পড়ে থাকেন, তাহলে রসায়ন বইয়ে রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল বা নীলস বোরের পরমাণু মডেল নিশ্চয়ই পড়েছেন। একজন একটা কিছু আবিষ্কার করছেন, কিছুদিন পরেই আরেকজন সেটার ত্রুটি খুঁজে বের করছেন, আগের সূত্র বাতিল হয়ে যাচ্ছে আর নতুন সূত্র পাচ্ছে প্রাধান্য। আমাদের এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বয়স প্রায় আড়াই হাজার কোটি বছর। এই রহস্যের কতটুকুই বা আমরা জানি? কিভাবে ব্রহ্মাণ্ডের সূচনা হলো? কিভাবে জগৎ গঠিত হলো? কিভাবে গ্রহ-নক্ষত্রের জন্ম হলো? পৃথিবীর বাইরে আর কোথায় আছে প্রাণের অস্তিত্ব? এই সব রহস্যের কিছুই আমরা জানি না। মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে আমাদের কোনো প্রমাণসূচক জ্ঞান নেই। যেটা আছে, সেটা হলো ধর্মীয় বিশ্বাস, যেটা আবার ধর্মভেদে আলাদা। অমরত্বকে আমরা হাতের মুঠোয় আনতে পারিনি, চিকিৎসাবিজ্ঞান মৃত্যুকে চিরতরে ঠেকিয়ে রাখার মতো আধুনিক এখনো হয়নি। এই জ্ঞানের শূন্যতার দিকেই আঙুল তুলেছে এপিস্টেমোলজি, বলছে মানুষ আসলে কিছুই জানে না, মানুষের কোনো জ্ঞান নেই।
এই নিহিলিজম পৃথিবীর বুকে প্রচলিত ধর্মগুলোকেও বকর করেছে। এখানেই প্রশ্ন উঠে, নিহিলিজম কি তাহলে ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বা ধর্মের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছে? উত্তরটা হলো – হ্যাঁ। যেহেতু নিহিলিজমের মূল আদর্শ হলো যুক্তি, অন্যদিকে ধর্মের মূল ব্যাপারটাই হলো বিশ্বাস, এ কারণে অকাট্য যুক্তির সঙ্গে প্রবল বিশ্বাসের সংঘর্ষ এখানে অনিবার্য। ধর্ম আমাদেরকে বলছে, আমরা যদি দুনিয়াতে ভালো কাজ করি, সৎ পথে চলি, স্রষ্টার বিধান মেনে চলি এবং যথাযথভাবে ধর্ম পালন করি, তাহলে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে আমরা পুরস্কৃত হব। অন্যদিকে নিহিলিজম বলে, মানুষের কাজের উপর তার ফলাফল নির্ভর করে না। যে কাজ করে একজন ভালো ফলাফল পেতে পারে, সেই একই কাজ আরেকজনের জন্য হতে পারে সম্পূর্ণ বিপরীত। তাছাড়া, মৃত্যুর পরে কোনো জীবন আছে বলে নিহিলিজম মানতেই রাজি নয়। কারণ সেই জগতের অস্তিত্ব কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি, সেসবের কথা শুধু ধর্মগ্রন্থেই লিখিত আছে। আবার হিন্দু ধর্মে যেমন পুনর্জন্মের উপর বিশ্বাস আছে, সেটাকেও অস্বীকার করে নিহিলিজম। কারণ নিহিলিজম বিশ্বাস করে যুক্তিতে, বিশ্বাস করে প্রমাণে। আর ধর্মের অস্তিত্ব দাঁড়িয়ে আছে শুধু এবং শুধুমাত্র বিশ্বাসের উপর। নিটশে বিশ্বাস করতেন ঈশ্বর কোনো ইন্ডিভিজুয়াল নন, ঈশ্বর আসলে একটা সিস্টেম – যে সিস্টেমটা আমাদের ভালো কাজ করতে এবং মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকার উপদেশ দেয়। এ কারণেই ফ্রেডরিখ নিটশে মানুষের নৈতিক অধঃপতন দেখে ঘোষণা করেছিলেন, "ঈশ্বর মারা গেছেন, আমরা তাকে নিজ হাতে হত্যা করেছি"। এই ঘোষণা পুরো ইউরোপকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
নিহিলিজমের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো মোরাল নিহিলিজম। মানুষের নৈতিকতা, যার উপর পুরো দুনিয়ার ভালো এবং মন্দ নির্ভর করছে, সেই নৈতিকতাকেও ভীষণ ঠুনকো হিসেবে দেখিয়েছে নিহিলিজম। নিহিলিজম বলছে, নৈতিকতা আসলে একটা জুজু, একটা ভ্রান্ত ধারণা। একজনের কাছে যেটা নৈতিক, সেটা আরেকজনের কাছে অনৈতিকও মনে হতে পারে। ধরুন, ভারতের ইনফোসিস কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণমূর্তি মন্তব্য করেছিলেন যে ভারতের ইঞ্জিনিয়াররা বেশ অলস প্রকৃতির, সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার বেশি কাজ করতেই চায় না, অথচ একজন তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের উচিত সপ্তাহে অন্তত ৭০ ঘণ্টা কাজ করা। তার এই বক্তব্যের পর তুমুল সমালোচনা শুরু হলো। অনেকেই তার বক্তব্যকে অমানবিক হিসেবে দেখলেন। একজন মানুষের কি কাজের বাইরে জীবন থাকতে পারবে না? তার ফ্যামিলি লাইফ থাকবে না? বিনোদন এবং ঘুমের জন্য সময় থাকবে না? এই কথাগুলো মোটেও ভুল নয়। অবশ্যই একজন মানুষ শুধু কাজ করবেন না, তার জীবনে পারিবারিক সময়, বিনোদন এবং ঘুমের জন্য সময় থাকবে। কিন্তু আপনি যদি একজন উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান মালিকের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো ব্যাপারটা দেখেন, নারায়ণমূর্তিকে আপনার কাছে ভুল মনে হবে না। তিনি ৭০ ঘণ্টা কাজের ব্যাপারটা বলেছিলেন অর্থনৈতিক চাকা সচল করার দৃষ্টিকোণ থেকে। যত বেশি কাজ, তত বেশি উৎপাদন, তত বেশি উন্নতি। এভাবে দেখলে নারায়ণমূর্তিকে কিন্তু কাঠগড়ায় তোলার তেমন একটা সুযোগ থাকে না। এই ব্যাপারটাকেই চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন ফ্রেডরিক নিটশে। তিনি এটার নাম দিয়েছিলেন মাস্টার মোরালিটি এবং স্লেভ মোরালিটি। নিটশের মতে, নৈতিকতা জিনিসটা পুরোপুরি আপেক্ষিক এবং এটা ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি প্রেক্ষিতে ভিন্ন রকম হয়। যেমন, একজন কারখানার মালিকের কাছে তার শ্রমিকের একদিন বেশি ছুটি চাওয়া কিংবা কাজে সামান্য ফাঁকিবাজিকে খারাপ মনে হতে পারে। আবার পুরো ঘটনাটা যদি আমরা শ্রমিকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলে মালিকের আচরণকে অমানবিক মনে হবে। উভয়পক্ষই কিন্তু নিজেদের দৃষ্টিতে নিজেদের মতো করে নৈতিকতাকে সংজ্ঞায়িত করে নেয়। নিহিলিজম এই ব্যাপারটার দিকেই আঙুল তোলে – যেখানে নৈতিকতার কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা বা পরিমাপ নেই, যেখানে নৈতিকতা পরম বা অ্যাবসলিউট নয়, বরং পরিস্থিতি ও ঘটনার উপর নির্ভরশীল বা সারকামস্ট্যান্সিয়াল। যে যার মতো নৈতিকতার সীমারেখা বানিয়ে নেয়, এবং আমাদের চারপাশে খেয়াল করলে দেখবেন, এটাই কিন্তু হররোজ ঘটছে। নিহিলিজম বলছে, নৈতিকতা বলে কোনো বস্তু আসলে নেই, বরং নৈতিকতা হচ্ছে মানুষের আবিষ্কৃত একটি ধারণা, যার মাধ্যমে সে নিজেকে সঠিক প্রমাণের চেষ্টা করে।
এতক্ষণ ধরে নিহিলিজম নিয়ে বকবক শোনার পরে একে হয়তো আজগুবি, গাঁজাখুরি বা অবাস্তব চিন্তা-ভাবনা মনে হতেই পারে আপনার। আবার এটাও মনে হতে পারে যে, নিহিলিজম ব্যাপারটা বুঝি সামগ্রিকভাবেই নেতিবাচক কিছু। হ্যাঁ, নিহিলিজমের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব বেশি, এটা স্বীকার করে নিতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে নিহিলিজমের ইতিবাচক দিকও কিন্তু আছে, সেটা হলো অপটিমিস্টিক নিহিলিজম। ভাবতে পারেন, নিহিলিজমের নামই যেখানে নৈরাশ্যবাদ, সেখানে আশা আসছে কোত্থেকে? এর মধ্যেও তো আশার দেখা যায়, সেটাকেই বলা হচ্ছে অপটিমিস্টিক নিহিলিজম। নিহিলিজম একদিকে বলছে জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নেই, নৈতিকতা নেই, সুনির্দিষ্ট কোনো প্যারামিটার নেই। অন্যদিকে, একই কারণগুলো দেখিয়ে নিহিলিজম বলছে, তাহলে কেন সমাজের চাপে অন্যের প্রত্যাশার বোঝা কাঁধে নিয়ে একটা বিরক্তিকর জীবন আপনি কাটাচ্ছেন? একটাই জীবন, আর সেই জীবনের সর্বময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার আপনার হাতে। তাহলে কেন জীবনটাকে উপভোগের পথে ছুটছেন না আপনি? কেন জীবনকে নিজের হাতে রাঙিয়ে নিচ্ছেন না? এই ব্যাপারটাকেই অপটিমিস্টিক নিহিলিজম হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
একজন সত্যিকারের নিহিলিস্ট আসলে পৃথিবীকে কিভাবে দেখে, বিভিন্ন বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা কেমন থাকে, এই জানাটা কিন্তু খুব জরুরি। প্রথমত, সে নিজেকে সামান্য একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী, একজন হোমো স্যাপিয়েন্স হিসেবে ভাবে। অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে তার কোনো ভিন্ন সম্পর্ক নেই এই পৃথিবীর বুকে। ছোট্ট একটি পিঁপড়ার যে গুরুত্ব, তার গুরুত্ব ঠিক এতটুকুই, এর চেয়ে বেশিও নয় আবার কমও নয়। নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য আমরা পৃথিবীটাকে যেভাবে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলেছি, যেভাবে অন্য প্রাণীদের বাসস্থল ধ্বংস করেছি, তাদের বিলুপ্ত করেছি, সেটা একজন নিহিলিস্টের চোখে অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা সবাই আমাদের বাবার নাম জানি, দাদার নামও অনেকে জানি, কিন্তু এর আগের পূর্বপুরুষদের নাম কি কেউ মনে রেখেছেন? আমরা কি মনে রেখেছি কয়েক প্রজন্ম আগে আমাদের পূর্বপুরুষ কি করতেন, কেমন ছিল তাদের জীবন, কোন ধর্ম তারা পালন করতেন, তাদের পেশা কি ছিল? এই সবকিছুই কিন্তু আমরা জানি না। আমরা বাঁচি আমাদের চারপাশ নিয়ে। ঠিক একইভাবে তিন প্রজন্মের পর আমাদের কথাও কেউ মনে রাখবে না। দেহ মাটির সাথে মিশে যাওয়ার সাথে সাথে আমরাও হারিয়ে যাব ইতিহাসে। তাহলে কিসের এত গল্প, কিসের অহংকার? এই ব্যাপারটা খুব ভালোভাবে মাথায় রাখে একজন নিহিলিস্ট। সে জানে একদিন সে মারা যাবে। মৃত্যুর ৫০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সবাই তাকে ভুলে যাবে। সে যা বলেছে, যাদের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছে, যাদেরকে ভালোবেসেছে, যার মূল্য দিয়েছে, যার জন্য লড়াই করেছে, তার সবই অর্থহীন। একজন নিহিলিস্ট তার সমস্ত কর্মকে অর্থহীন বলে মনে করে।
একজন নিহিলিস্ট সবসময় স্বাধীনচেতা হবে। মন খুলে কথা বলার স্বাধীনতা, যেটিকে আমরা বাকস্বাধীনতা বলে থাকি, সেটি হবে তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, একইসাথে আইনের ফাঁকফোকরগুলো খুঁজে বের করে সেগুলোকে সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের ব্যাপারেও আগ্রহী হবে। সে সমাজের গতানুগতিক নিয়মে চলতে চাইবে না – যেমন ২৪ বছর বয়স পর্যন্ত পড়াশোনা, তারপর চাকরি, ২৭-এ বিয়ে, ৩০-এ বাচ্চা, ৬০-এ চাকরি থেকে রিটায়ার আর পাঁচ-দশ বছর পর মরে যাওয়া – এই নিয়ম সে ভাঙতে চাইবে। সে প্রত্যাশার বোঝা বহন করতে অস্বীকৃতি জানাবে। সে তার নিজের নিয়মে জীবন কাটাতে চাইবে, সে জীবনকে সবচেয়ে বড় কথা, উপভোগ করতে চাইবে। সফল ব্যাপারটা তাকে খুব বেশি উত্তেজিত করবে না। সে কোনো টার্গেট সেট করে নিজের জীবন কাটাবে না, একটা একটা করে দিন সে পার করবে। সে জানে সে অমর নয়, একদিন তাকে চলে যেতে হবে, যে শূন্য থেকে সে এসেছে সেই শূন্যের কাছেই তাকে ফিরতে হবে – তাও আবার শূন্য হাতেই। যদি অর্জিত সাফল্য বা বস্তুগুলো আমি চিরকাল ধরে রাখতেই না পারি, তাহলে এই অর্জনের জন্য এত বেশি পরিশ্রম করে লাভ কী? এরকমটা সে ভাববে। তার মধ্যে আড়ম্বর থাকবে না, বাহুল্য থাকবে না। জীবনের জন্য বেসিক যে জিনিসগুলো প্রয়োজন, সেগুলো পেলেই সে মহাখুশি। নিহিলিস্টদের মধ্যে আরেকটা জিনিস নেই, সেটা হলো আপস। ধরা যাক একজন নিহিলিস্ট প্রচুর ধূমপান করেন, কিন্তু তিনি জানেন যে ধূমপান তার শরীরের জন্য ক্ষতিকর, ধূমপান থেকে ক্যান্সার হয়। সেটা জেনেও তিনি ধূমপান বন্ধ করবেন না। কারণ ধূমপানের মাধ্যমে যে শারীরিক আরাম তিনি পান, সেই ব্যাপারটার মূল্য তার কাছে মৃত্যু ভয়ের চাইতেও অনেক বেশি। মৃত্যু নিয়ে নিহিলিস্টদের অবস্থান হচ্ছে, মৃত্যু যখন আসবে তখন তো আসবেই। সেটাকে ঠেকিয়ে দেওয়ার বা প্রলম্বিত করার ক্ষমতা যখন আমার নেই, আমি আমার কাজটা করে যাই, জীবনকে না হয় উপভোগ করি।
নিহিলিস্টদের মধ্যে কি তাহলে মানবিক কোনো খারাপ দোষ বা ত্রুটি নেই? তারা কি এসবের ঊর্ধ্বে? না, ব্যাপারটা এমন নয়, তাদের মধ্যেও দোষ-ত্রুটি আছে। নিটশে বলেছিলেন, ভবিষ্যতে এই নিহিলিজম, এই অর্থহীনতার আর্তনাদ সব ধরনের সত্যকে নিঃস্ব একটা বস্তুতে পরিণত করবে। আর যেহেতু দুনিয়ার সকল রীতিনীতি, মূল্যবোধ সত্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট, তাই একজন নিহিলিস্টের কাছে সেই সবকিছু হয়ে যাবে শূন্য, এসবের কোনো গুরুত্ব থাকবে না। সুতরাং, নিহিলিস্ট যখন পাপ করবে, সেটা হবে নিকৃষ্টতম পাপ। নিহিলিস্ট যখন পুণ্য করবে, তা হবে বিশুদ্ধতম পুণ্য। নিটশে নিহিলিজমকে রোমান্টিক চোখে দেখেননি। তিনি এটাকে দেখেছেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ এক পরীক্ষা হিসেবে। নতুন কিছু তৈরি করতে গেলে শূন্য জায়গা লাগে। নিহিলিজম সেই শূন্য জায়গার স্রষ্টা। নিহিলিজম পার করার পর মানুষ অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে পেয়ে বাঁচা শুরু করবে। নিটশের ভাষায়, তারা তখন আর মানুষ নয়, ওভারম্যান – বাংলায় বললে মানবত্তীর্ণ এক সত্তা হিসেবে পরিগণিত হবে। নিটশে বর্ণিত এই ওভারম্যান হলো উচ্চতর, স্বতন্ত্র এক জাতি। নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে এরা প্রচন্ড রকমের আত্মবিশ্বাসী। সে জানে সে শক্তিশালী, তাই সে নিজের মূল্য নিজেই তৈরি করে। এই মূল্য অন্য কারো নির্ধারণ করে দেওয়া নয়। ওভারম্যান কেমন হবে তা বিস্তারিতভাবে নিটশে দাবি করেননি। তিনি চিন্তা করেছেন ওভারম্যানের অনুসারী বা রূপক ভাই থাকবে, কিন্তু ওভারম্যান নিজে কারো মতো নয়, সবার চেয়ে আলাদা হবে। নিটশে মূলত এমন একজন সক্রিয় নিহিলিস্টকে বুঝিয়েছেন, যিনি সকলের চেয়ে কাজে-কর্মে, চিন্তায়-মননে উৎকৃষ্ট। যখন সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকবে যারা প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ভেঙে ফেলতে চান, তখন সেই সকল মানুষের মধ্য থেকেই কিছু মানুষ এগিয়ে আসবে, যারা তাদের ভিন্নধর্মী চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন করবেন।
নিহিলিজমকে যারা পছন্দ করেন না, তারা একে বাস্তবতা বিবর্জিত ধারণা হিসেবে খারিজ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। আর নিহিলিজম ঠিক এই ব্যাপারটারই বিরোধিতা করে। জোর করে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া বা বাতিল করে দেওয়ার ঘোর বিরোধী নিহিলিজম। নিহিলিজম সাম্যের কথা বলে, পরিবর্তনের কথা বলে। নিহিলিজম যুক্তিতে বিশ্বাস রাখে, অকাট্য প্রমাণই তার কাছে শেষ কথা। নিহিলিজম জীবনের অর্থহীনতা অনুভব করে সব ধর্মীয়, সামাজিক, নৈতিক রীতিনীতি অস্বীকার করে। নিহিলিজম জীবনকে উপভোগ করার বার্তা দেয়। নিহিলিজম সামাজিক এবং পারিবারিক প্রত্যাশা এবং দায়িত্বের চাপে পিষ্ট হতে নিষেধ করে। এই কারণেই, অদ্ভুত হোক, অবান্তর হোক কিংবা বাস্তবতা-বিবর্জিত হোক, নিজস্ব ধরন এবং আইডিয়ার কারণে নিহিলিজমকে কেউ বাতিলের খাতায় আজও ফেলতে পারেনি। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের গ্রিক কবি অফ মেগারার কবিতা থেকে শুরু করে রাশিয়ান সাহিত্যিক তুর্গেনেভের উপন্যাসেও জায়গা পেয়েছে নিহিলিজম। নিটশে মারা গেছেন অনেক আগে, আজও তাকে বাতিলের খাতায় কিন্তু ফেলে দেওয়া যায়নি, তার ধ্যান-ধারণাকে মাটি চাপা দেওয়া যায়নি। একইভাবে বিলীন করে দেওয়া যায়নি নিহিলিজম নামের এই আদর্শকে। আগামী কয়েকশো বছরেও মনে হয় না সেটা খুব একটা সম্ভব হবে। বরং সময়ের সাথে সাথে নিহিলিজম আরও শক্তিশালী হবে এমন সম্ভাবনাই বেশি মনে হচ্ছে।
জীবন কি শুধুই এক বোকার গল্প, কিছু শব্দ আর ক্রোধের সমাহার, যার অর্থ সবই অনর্থ, যেমনটা ম্যাকবেথের কথায় শেক্সপিয়ার বলছেন? জীবনের এই অন্তহীন যাত্রার শেষমেশ প্রাপ্তিটা কী? সেই অসীম শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা কি প্রশ্ন করতে পারি না, কেন এই চঞ্চলতা, কোথা থেকে এলো এই জীবনের বারতা? বিখ্যাত পারস্য কবি ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াতের দুটো লাইন এই ভয়ংকর সত্যটা মনে করিয়ে দেয় – “হৃদয় দিয়ে খুঁজিও না লাভ বা ক্ষতি ঢের, গুছাইয়া লও কারণ সে আসিবে না ফের”। বাংলার বাউল ফকিরের মুখেও একই সুর বাজে – “এমন মানব জনম আর কি হবে। মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে”। জীবনের অর্থ খুঁজতে গিয়ে গৌতম বুদ্ধ যেমন দুঃখ ছাড়া জীবনের কোনো মানে নেই বুঝেছিলেন, ডেভিড হিউমও বলেছিলেন, "এই মহাবিশ্বের কাছে একজন মানুষের জীবনের গুরুত্ব একটা ঝিনুকের থেকে বেশি নয়"। আল্বেয়ার কামু 'দ্য মিথ অব সিসিপাস' এবং 'দ্য স্ট্রেঞ্জার'-এ জীবনকে অর্থহীনতার চিত্র এঁকেছেন দারুণ দরদ দিয়ে। বিশ শতকের অস্থিরতা নিহিলিজমকে মানুষের কাছে জনপ্রিয় করেছে, জীবনের উদ্দেশ্যহীনতা, সামাজিক প্রথা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে একত্রিত করেছে। আমাদের এই মহাবিশ্বে বেঁচে থাকার অর্থ যখন গভীরভাবে খুঁজে পাই, তখন সবকিছু আনন্দময় হয়ে ওঠে, পৃথিবী তখন খুব অর্থপূর্ণ মনে হয়। কিন্তু নিহিলিজম সেই আশাবাদের মাথায় জল ঢেলে দিয়ে বলে, “বলো না কাতর স্বরে বৃথা জন্ম এ সংসারে, এ জীবন নিশার স্বপন”। আশাবাদ আর নৈরাশ্যবাদের এই হার না মানা যুদ্ধের মধ্যেই নিহিলিজম এক চরম সত্যে পৌঁছাতে চেষ্টা করেছে। ম্যাথু আর্নল্ডের 'ডোভার বিচ' কবিতায় যেমন বিশ্বাসের দেওয়াল ভেঙে পড়ার কাব্যিক দ্যোতনা ছিল, তেমনি অসওয়ার্ল্ড স্পেংলার তার 'দ্য ডিক্লাইন অব দ্য ওয়েস্ট' গ্রন্থে পশ্চিমা সভ্যতার অবনমনকে নিহিলিজমের ফল হিসেবে দেখেছেন। শূন্যতা কি তবে অবশ্যম্ভাবী? জীবনের কোনো এক সময়ে হয়তো প্রত্যেকেরই মনে হয়েছে, এ জীবন অর্থহীন, কাজেই এ জীবন টেনে নিয়ে লাভ কী? জীবন যেন না জানা একমুখী পথ ধরে এগোনো ক্ষণিকের এক প্রলোভন। এই গভীর চিন্তাধারা আমাদের জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্যের দিকে নিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু সম্ভবত এটাই শেষ কথা নয়। জীবনের প্রতি মুহূর্তে আমরা সূর্য-নক্ষত্রের সাথে বাঁধা, দূর আকাশের ছায়াপথ থেকে যে আলোকধারা নেমে আসে, তা আমাদের চক্ষু চুম্বন করে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে বেঁধে রাখে সখ্যডোরে। মহাকালযাত্রী মহাবাণী আমাদের আত্মার যাত্রাপথকে অনন্তের পানে নির্দেশ করে। সেই মহাবিস্ময়ে আমরা একাকী যাত্রী, অফুরন্ত সেই পথ।



কোন মন্তব্য নেই