কাকে ভোট দেবেন আর কাকে নয়? শরীয়তের মানদণ্ডে যোগ্য প্রার্থী চেনার উপায়।
কল্পনা করুন তো এমন একটি মুহূর্তের কথা, যেখানে আপনার একটি আঙুলের ছাপ বদলে দিতে পারে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য, অথচ আপনি নিস্পৃহ হয়ে বসে আছেন। ভাবুন তো, একটি বিশাল সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে আপনি দেখছেন একটি নৌকা ডুবতে বসেছে, আপনার হাতে একটি বৈঠা আছে, কিন্তু আপনি ভাবছেন—আমার একার বৈঠা চালানোয় কী-ই বা আর হবে! ঠিক এই দ্বিধা আর নিস্পৃহতার জালে আজ আমরা অনেকেই আটকা পড়ে আছি, বিশেষ করে যখন সামনে আসে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রশ্ন। ইসলামের অনুসারী হিসেবে আমাদের মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়—যেখানে ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয় বরং একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, সেখানে এই আধুনিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোট দেওয়া কি আমাদের জন্য আদৌ জায়েজ? নাকি রাজনীতি থেকে দূরে থাকাই প্রকৃত দ্বীনদারী? আজকের এই আলোচনা সেই লুকানো সত্য আর ধর্মীয় গভীরতার গোলকধাঁধায় আপনাকে নিয়ে যাবে, যেখানে আমরা খুঁজে দেখব আমাদের একটি ভোটের ওজন ইসলামের দাঁড়িপাল্লায় কতটুকু।
ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামকে কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং একটি আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ মুসলিম দেশগুলোতে সেই খেলাফত বা ইসলামী শাসন ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর; অধিকাংশ দেশই এখন পরিচালিত হয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। আর এই পদ্ধতি নিয়ে আমাদের অনেকের মনেই এক ধরণের সংশয় কাজ করে। বিশ্বখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ এবং পাকিস্তানের সাবেক বিচারপতি আল্লামা মুফতি মোহাম্মদ তাকি উসমানী এই বিষয়ে অত্যন্ত গভীর একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, বর্তমান সময়ের কলুষিত ও নোংরা রাজনীতি দেখে অনেক নেককার ও ভালো মানুষ নিজেদের গুটিয়ে রাখতে চান। কিন্তু মুফতি তাকি উসমানীর মতে, এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা যে রাজনীতি বা নির্বাচনের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং বাস্তবতা হলো, যখন ভালো মানুষরা রাজনীতির মাঠ ছেড়ে দেন, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করে একদল অসৎ আর স্বার্থপর মানুষ, যার চরম মূল্য দিতে হয় পুরো জাতিকে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিস আমাদের এই নিষ্ক্রিয়তার ভয়াবহতা বুঝিয়ে দেয়। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল বলেছেন, যখন মানুষ কোনো জালেমকে জুলুম করতে দেখেও তার হাত ধরে না অর্থাৎ তাকে বাধা দেয় না, তখন আল্লাহ তাআলা খুব শীঘ্রই সবার ওপর সাধারণ শাস্তি নাজিল করেন। নির্বাচনের ময়দানকে যদি আমরা সেই জুলুম প্রতিরোধের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখি, তবে সেখানে অংশগ্রহণ করা কেবল নাগরিক অধিকার নয়, বরং এক ধরণের ঈমানী দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। অনেকে ভাবেন, আমি একজন মানুষ ভোট না দিলে কী এমন ক্ষতি হবে? কিন্তু মনে রাখবেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় মাত্র একটি ভোটের ব্যবধানেও একজন অযোগ্য মানুষ ক্ষমতায় বসে যেতে পারে, যার দায়ভার আর ক্ষতি বয়ে বেড়াতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকেও। শরীয়তের দৃষ্টিতে এই ভোট দেওয়াটা স্রেফ একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, বরং এটি হলো একটি ‘সাক্ষ্য দান’ বা ‘শাহাদাত’।
পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২৮৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না; যে ব্যক্তি তা গোপন করবে তার হৃদয় হবে পাপী। ভোট দেওয়ার অর্থ হলো আপনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, আপনার জানামতে অমুক প্রার্থী দেশ ও জাতির জন্য সবচেয়ে যোগ্য এবং আমানতদার। এখন যদি আপনি ভোট না দিয়ে ঘরে বসে থাকেন, তবে আপনি মূলত একটি সত্য সাক্ষ্য গোপন করছেন, যা ইসলামে হারাম ও গুনাহের কাজ হিসেবে বিবেচিত। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে, সর্বোত্তম সাক্ষী হলো সে ব্যক্তি, যে সাক্ষ্য চাওয়ার আগেই তা প্রদান করে। অর্থাৎ দ্বীনদারীর পরিচয় ভোট থেকে দূরে থাকায় নয়, বরং ভোটের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমানত রক্ষা করায়।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যদি আমরা দৃষ্টি দেই, তবে দেখব বিশ্বের প্রায় ৯৫ হাজার আলেমের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ মুসলিম স্কলারস’ নির্বাচনে অংশগ্রহণকে ‘শরয়ী ফরজ’ এবং নাগরিক কর্তব্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিশেষ করে ২০১১ সালের আরব বসন্তের পর যখন মধ্যপ্রাচ্যে স্বৈরাচারের পতন ঘটছিল, তখন তারা ফতোয়া দিয়েছিলেন যে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা ‘ফরজে আইন’। এর মানে হলো এটি এমন এক দায়িত্ব যা প্রত্যেকের ওপর ব্যক্তিগতভাবে অর্পিত; কিছু মানুষ ভোট দিলেই বাকিরা দায়মুক্ত হতে পারবেন না। ইসলামে শাসক নির্বাচনের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো একটি বাঁধাধরা পদ্ধতি কুরআন-সুন্নাহয় বাতলে দেওয়া হয়নি, বরং এটি জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শাসকের গুণাবলী কেমন হবে—যেমন ন্যায়বিচারক, আমানতদার এবং শক্তিশালী হওয়া—তা স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। সূরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমানত যেন তার যোগ্য ব্যক্তির হাতেই অর্পণ করা হয়। ভোট হলো সেই আমানত, যা একজন মুমিন কেবল যোগ্য ব্যক্তির হাতেই সঁপে দিতে পারে।
ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দও এই বিষয়ে অত্যন্ত স্বচ্ছ ধারণা প্রদান করেছে। তাদের মতে, মুসলিমদের জন্য নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া বা ভোট দেওয়া নাজায়েজ নয়, যদি উদ্দেশ্য হয় দেশ ও জাতির সেবা করা এবং মজলুমের পাশে দাঁড়ানো। তবে সাবধান থাকতে হবে যেন এই ক্ষমতা বা নির্বাচন কেবল দুনিয়াবী স্বার্থ, টাকা বা পদের লোভে না হয়। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, প্রতারণা কিংবা ইসলামবিরোধী কোনো পথ অবলম্বন করে ক্ষমতায় যাওয়া ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী। দেওবন্দের ফতোয়া অনুযায়ী, একজন ভালো ও যোগ্য মানুষকে ভোট দেওয়া সওয়াবের কাজ এবং এটি একটি শরয়ী ওয়াজিব দায়িত্ব। বিপরীতে, একজন অযোগ্য, জালেম বা ফাসেক ব্যক্তিকে জেনে-বুঝে ভোট দেওয়া হলো মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার সমান, যা একটি মহাপাপ। মহান আল্লাহ সূরা মায়েদা এবং সূরা নিসায় আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমরা ইনসাফের সাক্ষী হিসেবে অটল থাকি।
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, আমাদের ভোট দেওয়ার সময় কোন বিষয়গুলো মাথায় রাখা উচিত? প্রথমত, ভোট দেওয়ার সময় অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যেন আপনার মূল্যবান ভোটটি ভুল জায়গায় না পড়ে। পারস্পরিক পরামর্শ এবং চিন্তাভাবনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারো ব্যক্তিগত অনুরোধ, আত্মীয়তার সম্পর্ক কিংবা টাকার চাপে পড়ে ভোট দেওয়া যাবে না। মনে রাখবেন, ভোট বিক্রয় করা বা টাকা নিয়ে ভোট দেওয়া সরাসরি ঘুষ এবং হারাম কাজ। যদি আপনি দেখেন যে কোনো প্রার্থীই আদর্শ নয়, তবে তাদের মধ্যে যার মাধ্যমে ক্ষতি কম হওয়ার সম্ভাবনা এবং উপকারের আশা বেশি, তাকেই বেছে নিতে হবে। ভোট দেওয়ার সময় আপনার নিয়ত থাকতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জাতির কল্যাণ।
আমরা যদি এই পুরো বিষয়টিকে একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখি, তবে বুঝব যে রাজনীতি আর ধর্মকে আলাদা করে দেখার কোনো অবকাশ ইসলামে নেই। যারা মনে করেন ধর্ম কেবল নামাজ আর রোজার চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ, তারা আসলে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপটি অনুধাবন করতে পারেননি। আপনার একটি সঠিক ভোট যেমন একজন সৎ মানুষকে ক্ষমতায় বসিয়ে সমাজ থেকে অন্যায় দূর করতে পারে, তেমনি আপনার নিরবতা সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আমাদের বর্তমান সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আমাদের সন্তানরা কেমন পরিবেশে বড় হবে। তাই ভোটদানকে কেবল একটি পার্থিব কাজ মনে না করে একে একটি পবিত্র আমানত এবং আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি।
আমরা আজ এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপেই আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং ইনসাফ কায়েমের জন্য ভোটের সঠিক ব্যবহার ছাড়া আর কোনো সহজ বিকল্প আমাদের হাতে নেই। আল্লামা মুফতি তাকি উসমানী থেকে শুরু করে দেওবন্দের আলেমগণ যে পথের দিশা দিয়েছেন, তা আমাদের এটাই শেখায় যে, মুমিন কখনো পলায়নপর হতে পারে না। বরং প্রতিকূল পরিবেশেও ন্যায়ের পক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করাই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
পরিশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো খেলাফত ব্যবস্থা, যা ইনসাফ ও খোদভীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। যদিও বর্তমানে আমরা সেই আদর্শিক খেলাফত থেকে দূরে আছি, তবুও বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের সাধ্যমতো ইনসাফ কায়েমের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতেও নজর দিতে হবে। আজকের এই পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে যেমন দ্বীনী জ্ঞান প্রয়োজন, তেমনি আধুনিক প্রযুক্তির শিক্ষাও অপরিহার্য, যাতে আমরা পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। আমাদের প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি ভোট এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন হয় কেবল সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে—এটাই হোক আজকের দিনের অঙ্গীকার।

কোন মন্তব্য নেই